Sunday, 20 March 2016

হোলি আর নেড়াপোড়া নিয়ে কিছু কথা

নেড়াপোড়ার প্রাক্কালে

আজ কেন জানিনা একদাম কাজ করতে ইচ্ছে করছে না। অফিসে এলেও মন বারবার ফিরে যাচ্ছে শৈশবে। কাল দোল, মানে আজ নেড়াপোড়া। এই সময়ে শৈশবে প্রায় এক সপ্তাহ আগে থাকতে আমাদের তৎপরতা থাকতো তুঙ্গে। বাড়ীর কাছের কলাবাগান গুলো থেকে শুকনো পাতা মানে বাসনা কেটে এনে বাড়ীর পাশে জড় করা, বেশ শক্তপোক্ত দেখে দুটো বাঁশ যোগার করা কি চাদ্দিখানি ব্যাপার? এছাড়া শুকনো আম পাতা, কাঁঠালপাতা, দড়ি, মাটির হাঁড়ি আরও কত কি? এই একসপ্তাহ খেলা ভুলে জিনিসপত্র জোগাড়ে মন থাকতো আমাদের।আর দুপুরবেলা থেকেই শুরু করে দিতাম নেড়াপোড়ার প্রস্তুতি। বাঁশ দুটো আড়াআড়ি ভাবে বেঁধে তাতে শুকনো কলাপাতা (বাসনা) বেঁধে মোটামুটি চেষ্টা চলত একটা মানুষের অবয়ব দেওয়ার। যেটাকে আমরা বুড়ী বলতাম, আর এই জন্নে গ্রাম বাংলায় আজও নেড়াপোড়া কে বুড়ী পোড়ানো বা চাঁচর বলে ডাকা হয়। আমরা ৮-৯জন কচিকাঁচা মিলে সব করতাম, কি অনাবিল আনন্দ খুঁজে পেতাম এই সব গ্রাম্য খেলায়। মাঝে মাঝে নিজেরা চাঁদা দিয়ে বেশ কিছুটা খড় কিনতাম, যেটা ওই কলাপাতার উপর দিয়ে বেঁধে দিতাম, ব্যাস আর কি নেড়া তখন আরও সুন্দরী (নেড়া বা বুড়ী পোড়ানো মানে বুড়ী স্ত্রীলিঙ্গ তখন নেড়া কে সুন্দরী বলতে আপত্তি কোথায়?)। আমাদের দলের মধ্যে শান্তনু ছিল শিল্পী, সেই চক দিয়ে মাটির হাঁড়ির উপরে সুন্দর করে বুড়ীর চোখ, নাক আঁকত। আমার আজও মনে পরে আমার বাবা আমাদের এই নেড়াপোড়ায় খুব সাহায্য করতেন, শাবল দিয়ে মাটি খুঁড়ে বাঁশ পুতে তাতে নেড়া বা বুড়ী বানানোয় বাবার অবদান ছিল অবর্ণনীয়। কালীপূজোর শেষে কয়েকটা চকলেট বোম আলাদা করে রেখে দিতাম এই নেড়াপোড়ার জন্নে, চকলেট বোমের আওয়াজ ছাড়া নেড়াপোড়া জমে কি? আমি মায়ের কাছে গিয়ে আগে থাকতেই আবদার করে রাখতাম – মা মা বেশ কয়েকটা বড় বড় আলু আর টমাটো দিতে হবে কিন্তু। মা হেসে বলত – আরে পাগল কোনদিন না দিয়েছি তোকে? নেড়া বা বুড়ী তৈরি হয়ে গেলে ওর ভিতরে  বড় মাটির ভাঁড়ে করে ওই আলু আর টমাটো দিতাম। নেড়াপোড়ার শেষে ওই পড়া আলু আর টমাটো একটু আঁচারের তেল আর কাঁচা লঙ্কা দিয়ে খাবার মজাই আলাদা। 

নেড়া বা বুড়ী বানানোর পর সেটাকে আমরা দল বেঁধে পাহারা দিতাম, নইলে অন্য পাড়ার ছেলেরা এসে আগুন দিয়ে দেওয়ার ভঁয় থাকত। তারপর সন্ধ্যাবেলায় সুরজিমামা অস্ত গেলে আমরা তৈরি হতাম নেড়াপোড়ার জন্নে, আগে আমরা আসে পাশের বাড়ীর কাকু, কাকিমা, ছোট ছোট ভাই- বোনেদের ডাকতাম, সবাই মিলে একসাথে মজা না করলে আনন্দ যে ডবল হতো না। আর তখন আমাদের সমাজও এতো জটিল হয়ে ওঠেনি, সবাই একসাথে আনন্দ ভাগ করে নিতে জানতাম। সব কাকু, কাকিমা, দাদা দিদি সবাই মিলে মাঠে শতরঞ্জি পেতে বসে জমিয়ে আড্ডা দিতে দিতে নেড়াপোড়ানো হতো। একটা বাঁশের কঞ্চির মাথায় একটু নেকরা কাপড় বেঁধে, সেটা কে কেরোসিন তেলে ডুবিয়ে আগুন দিয়ে দেওয়া হতো নেড়ার গায়ে। নেড়ার সেই পলাশ শিমুল আগুনের রঙ রাঙ্গিয়ে দিত আকাশ। আকাশের দিকে উঠে যাওয়া সেই উদ্দাম আগুনের নৃত্যে আমরাও নেচে উঠতাম হাততালি দিয়ে আর সবাই মিলে চেঁচিয়ে বলতাম - “আজ আমাদের নেড়াপোড়া কাল আমাদের দোল। পূর্ণিমাতে চাঁদ উঠেছে বোলো হরি বোল।“ চকলেট বোমের আওয়াজে আর আমাদের হই হুল্লোড়ে চারিদিক গমগম করতো। যতক্ষণ নেড়া জ্বলত আমরা আমাদের হই হুল্লর চালিয়ে যেতাম আর মা, কাকিমারা বসে গল্প জুড়ত, সাথে বাবা, কাকারাও বসে যেত।

নেড়া যখন নিভে আসত মা, কাকিমারা ওই নেড়ার আগুনে মঠ, ফুটকড়াই ছুড়ে দিয়ে নমস্কার করতো আর আমাদেরও বলত নমস্কার করতে, তারপর পিতলের থালায় সাজানো মঠ, ফুটকড়াই দিত আমাদের।অনেক সময় আবার আলুর চপ, শিঙ্গাড়া পেতাম উপরি পাওনা হিসাবে। এরপর নিভন্ত নেড়ার (বুড়ীর) ভিতর থেকে মাটির ভাঁড় খুঁজে বের করতাম আমরা, অনেকসময়ই টমাটো পেতাম না, পেতাম কালো, পুরে যাওয়া আলুগুলো, আলুগুলো একটু জলে ধুয়ে নিয়ে আঁচারের তেল, কাঁচা লঙ্কা মেখে চলত আমাদের চড়ুইভাতি।
তারপরও বেশ কিছুক্ষণ আড্ডা মেরে বাড়ী ফিরতাম সবাই। আর তার মধ্যেই প্ল্যান হয়ে যেত এবারে কাকে বেশি রঙ মাখান হবে, কে কি রঙ, আবীর কিনেছি বা কার কটা পিচকারী, বেলুন হয়েছে।

হোলি হায় ভাই হোলি হায়, বুরা না মানো আজ হোলি হায়

সকাল হতে না হতেই আমরা জুতে যেতাম রঙ বানানো, বেলুন বানানোর কাজে। মা কে বিরক্ত করে মারতাম বালতি দাও বালতি দাও বলে। ২-৩ খানা বালতি নিয়ে রঙ গোলা হতো, আর এই কাজে বরাবরের মতো সাহায্য করতো আমার বাবা। কোন বালতি তে গোলাপি রঙ, আবার কোনটায় ঘন সবুজ রঙ বা লাল রঙ। এরপর পিচকারী দিয়ে বেলুন গুলোই রঙ ভরে জল ভর্তি বালতি তে ডুবিয়ে রাখতে হতো, নইলে ফেটে যাওয়ার সম্ভবনা থাকত। রঙ ঠিকঠাক হয়েছে কিনা দেখার জন্নে বাড়ীর পাশের কলাগাছ আর পোষা ভুলো কুকুর তো ছিলই। ভুলো টা ছিল আমার খুব নেওটা, সারাদিন আমার সাথেই ঘুরে বেড়াতো। খালি রঙ দিলে কুই কুই করে এসে পায়ে লুটিয়ে পড়ত, যেন বলত – রঙ দিয়না দাদা, রঙ যে আমার সয়না। আমাদের বাড়িতে এছাড়াও দুইখানি জার্মান স্পিজ কুকুর ছিল – লুসি আর সিমি। ওদের আমি আবীর এর টিপ পরিয়ে দিতাম।আর বলতাম – তোরা চুপ করে বস, আমি রঙ খেলে এসে তদের নিয়ে খেলব। কি বুজত কে জানে খালি ভুকভুক করে বকত আর প্যান্ট ধরে টানাটানি করতো, কিছুতেই যেতে দেবে না, ওদের সাথেই খেলতে হবে আমায়। অনেক কষ্টে অন্য ঘরে আটকে তবে যেতে পারতাম। আমরা রঙ খেলার আগে বাড়ীর বড়দের পায়ে আবীর দিয়ে প্রণাম করতাম, সাথে পাওনা ছিল হলুদ, গোলাপি, সাদা রঙের চিনির মঠ আর ফুটকড়াই। মা, বাবা মাথায় আবীরের টিপ দিয়ে বলত বেশি দূরে কোথাও যাবেনা, আর বেশি রঙ খেলা নয় ঠিক আছে? ঘাড় কাত করে হ্যাঁ বলে একছুটে রাস্তায় সাথে ভুলো কুকুর, যেখানে আমার বন্ধুরা অপেক্ষা করছে আমার জন্নে। তারপর তো শুদু হোলি হাঁয়, একে অপর কে রাঙিয়ে দেওয়ার পালা আজ। আর মুঠো মুঠো আবীর আকাশের দিকে ছুড়ে দিয়ে মোহিত হয়ে দেখা – আর চেনা মেয়ের মুখে আবীরের ছটা, লাজুক মুখে রঙ মাখানো সব কেমন ভালোলাগায় মেশানো। আজ চারিদিকে শুদু অদ্ভুত এক ভালোলাগা। কিভাবে যেন কেটে যেত সময়, মার ডাকে ফিরে যেতাম বাড়ীর পানে। আর গেলেই মা বলে উঠত – উফফ কি ছিরি করেছিস মুখটার? চল গরম জল করে সাবান মেখে স্নান করবি চল। আর যদি জ্বর বাঁধাস তো দেখবি ... ...। বাড়ী ফিরতেই পোষা লুসি, সিমি ঝাঁপিয়ে পড়ত, আর আমার রঙ মাখা মুখ দেখে ভুকভুক করে সমানে বকে যেত, যতক্ষণ না স্নান ছেড়ে একটু ধাতস্ত হতাম। বেলার দিকে পাড়ার সব বড় কাকু, কাকিমা রা আসত বাড়িতে, বড় দের দোল টা ছিল একটু অন্নরকম, শুদু আবীর দেওয়া আর ছেলেদের কোলাকুলি আর মেয়েদের লাল আবীরের টিপ দেওয়া। সাথে অবশ্য মিষ্টিমুখ তো ছিলই। আমিও প্রত্যেকবার ভাগ পেতাম মিষ্টির, মঠ, ফুটকড়াইয়ের, খেলা শেষে অনেক সময় দুপুরে সবাই একসাথে বসে খাওয়া দাওয়া হতো। সেটা আবার উপরি পাওনা।

এখন দোলের সময় অফিস ছুটি থাকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে পাড়ার কচিকাঁচা আর বড়দের রঙ খেলা, দেদার মাইকের আওয়াজ আর অফুরন্ত হই হুল্লোড় দেখি। সঙ্গে মদের থুড়ি জলের নেশায় চটুল হিন্দি গানের সাথে কোমর দোলানো বা অভব্যতাও চোখে পড়ে, এখন আর নিজেকে রাঙিয়ে নেওয়ার চাহিদা অনুভব করি না। উল্টে বিষণ্ণতায় ভরে যায় মন, কেন জানিনা খুব মিস করি সেই ছোটবেলাটাকে। আর অনেক তফাত খুঁজে পাই সেদিনকার সেই দোল খেলা আর আজকের দোল খেলার মধ্যে। 

তবু আমি মনে করি প্রত্যেকটি মানুষের একবার অন্তত জীবনে রঙ খেলা উচিত। একমাত্র বসন্তের রঙই পারে বিবর্ণ, মলিন জীবন কে রাঙিয়ে তুলতে। নইলে হয়তো সেই স্বার্থপর দৈত্য তার মতো আফসোস করতে হবে - "How selfish I have been, now I know why the spring would not come here"। তাই প্রত্যেকটি মানুষের মনের বাগানে বসন্ত জাগ্রত হোক, আকাশে বাতাসে আবীরের গন্ধ ভেসে বেড়াক, গাছভরা পলাশ ফুল ঝরে পরুক রাস্তায়, আগুন লাগুক মানুষের মনে ও প্রানে।

হোলি বা দোল নিয়ে কয়েকটি কথা



হোলি বা দোল নিয়ে কয়েকটি কথা না বলে পারছি না, অনেকেই হয়তো জানেন তাও আর ও একবার বলতে মন চাইল। দৈত্যরাজ হিরণ্যকিশপুর কাহিনি আমরা সকলে জানি। ভক্ত প্রহ্লাদ অসুর বংশে জন্ম নিয়েও পরম ধার্মিক ছিলেন। হিরণ্যকিশপু এটা কোন ভাবেই মানতে পারেন নি, তাই তিনি নির্দেশ দেন প্রহ্লাদকে হত্যা করার। তাঁকে যখন বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেও হত্যা করা যাচ্ছিল না তখন হিরণ্যকিশপুর বোন হোলিকা প্রহ্লাদকে কোলে নিয়ে আগুনে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেন। কারণ হোলিকা এই বর পেয়েছিল যে আগুনে তার কোন ক্ষতি হবে না। কিন্তু অন্যায় কাজে শক্তি প্রয়োগ করায় হোলিকা প্রহ্লাদকে নিয়ে আগুনে প্রবেশ করলে বিষ্ণুর কৃপায় প্রহ্লাদ অগ্নিকুণ্ড থেকেও অক্ষত থেকে যায় আর ক্ষমতার অপব্যবহারে হোলিকার বর নষ্ট হয়ে যায় এবং হোলিকা পুড়ে নিঃশেষ হয়ে যায়, এই থেকেই হোলি কথাটির উৎপত্তি ।
এছাড়া বৈষ্ণব মতে, ফাল্গুনী বা দোলপূর্ণিমার দিন বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণ আবীর ও গুলাল সহযোগে শ্রী রাধিকা ও অন্যান্য গোপীগণের সাথে রঙ খেলায় মেতে উঠেছিলেন, অনেকের মতে সেই থেকেও দোল খেলার উৎপত্তি। এখনও নবদ্বীপ বা অন্যান্য বৈষ্ণব প্রধান এলাকায় দোল যাত্রার দিন রাধা ও কৃষ্ণের বিগ্রহ কে আবীর ও গুলালে স্নান করিয়ে দোলা বা পালকি তে চরিয়ে কীর্তন গান সহযোগে শোভাযাত্রা বের করা হয়। আর ভক্তরা নিজেদের মধ্যে রঙ খেলেন।      
অন্যদিক বসন্তের পূর্ণিমার এই দিনে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কেশি নামক অসুরকে বধ করেন। কোথাও কোথাও অরিষ্টাসুর নামক অসুর বধের কথাও আছে। অন্যায়কারী, অত্যাচারী এই অসুরকে বধ করার পর সকলে রঙ নিয়ে আনন্দ করে। অঞ্চল ভেদে হোলি বা দোল উদযাপনের ভিন্ন ব্যাখ্যা কিংবা এর সঙ্গে সংপৃক্ত লোককথার ভিন্নতা থাকতে পারে কিন্তু উদযাপনের রীতি এক ।বাংলায় আমরা বলি দোলযাত্রাআর পশ্চিম ও মধ্যভারতে হোলি’,। রঙ উৎসবের আগের দিন হোলিকা দহনহয় অত্যন্ত ধুমধাম করে । শুকনো গাছের ডাল, কাঠ ইত্যাদি দাহ্যবস্তু অনেক আগে থেকে সংগ্রহ করে সুউচ্চ একটি পুতুল বানিয়ে তাতে অগ্নি সংযোগ করে হোলিকা দহনহয় । পরের দিন রঙ খেলা । বাংলাতেও দোলের আগের দিন এইরকম হয় যদিও তার ব্যাপকতা কম আমরা বলি চাঁচর বা নেড়াপোড়া । এই নেড়াপোড়া বা  চাঁচর কে নিয়েও পুরাণে  একটি গল্প পাওয়া যা। বলা হয় এই দিনে শ্রী কৃষ্ণ মেড়া তথা মেসাসুর কে বধ করার পরে যে আনন্দ উৎসব হয়েছিলো পরবর্তীকালে মেড়া পোড়ানো অপভ্রংশে হয়ে যায় নেড়া পোড়ানো।  
 
সামাজিক দিক থেকে হয়তো অন্যরকম ব্যাখ্যা আছে, দোল আমাদের ঋতুচক্রের শেষ উৎসব । পাতাঝরার সময়, বৈশাখের প্রতীক্ষা। এই সময় পড়ে থাকা গাছের শুকনো পাতা, তার ডালপালা একত্রিত করে জ্বালিয়ে দেওয়ার মধ্যে এক সামাজিক তাৎপর্য রয়েছে । পুরনো জঞ্জাল, রুক্ষতা, শুষ্কতা সরিয়ে নতুনের আহ্বান হচ্ছে এই হোলি। বাংলায় দোলের আগের দিন চাঁচর বা নেড়াপোড়া কে এভাবেই ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।

এই দোল বা হোলি আমাদের হিন্দু সভ্যতার অন্যতম প্রাচীন উৎসব। আমাদের বেদ ও পুরানেও এর উল্লেখ আছে, ৩০০ খ্রিস্টপুরবাব্দের একটি শিলালিপি তে রাজা হর্ষবর্ধনের দোল খেলার  বিবরণ আছে এছাড়া রাজা হর্ষবর্ধনের সময়ে একটি নাটিকাতেও রঙ খেলার উল্লেখ আছে। মধ্যপ্রদেশের রামগড়ে যে গুহালিপি দেখতে পাওয়া যাই তাতেও দোল উৎসবের কথা পাওয়া যায়। আর বাৎস্যায়ন রচিত কামসুত্রেও দোল খেলার কথা বর্ণিত আছে।

আমরা অনেকে হয়তো জানি না দোলপূর্ণিমার এই পুণ্যলগ্নে নবদ্বীপের গঙ্গাপাড়ে জন্মেছিলেন শ্রীচৈতন্যদেব, তাই এই ফাল্গুনী পূর্ণিমার দোলের দিনটিকে ‘গৌরপূর্ণিমা’ও বলা হয়। দোল বা নেড়াপোড়া বা চাঁচর নিয়ে পুরাণে বা আমাদের সাহিত্যে, ইতিহাসে যাই থাকুক না কেন, পুরাকাল থেকেই এটি ভারতের অন্যতম প্রাচীন প্রাণোচ্ছল উৎসব। নতুন করে জেগে ওঠার, নতুন আনন্দে, নতুন আশায় নিজেকে রঙিন হয়ে ওঠার এই উৎসবের প্রাক্কালে সবাই ভালো থাকুন আর ভালো রাখুন।



Friday, 29 January 2016

অম্বিকা কালনা – আর এক মন্দির নগরীর ইতিকথা




অম্বিকা কালনা – আর এক মন্দির নগরীর ইতিকথা


“ক্ষান্তবুড়ির দিদিশাশুড়ির, পাঁচ বোন থাকে কালনায়। শাড়িগুলো তারা উনুনে বিছায়, হাঁড়িগুলো রাখে আলনায়”। ছোটবেলায় পড়া এই কবিতাটি আমার বেশ লাগত, কে জানে তখন থেকেই কালনায় যাবার টান তৈরি হয়েছিলো কিনা? তবে এটা ঠিক কালনার গৌরবময় ইতিহাস আমায় হাতছানি দিয়ে বারবার ডাকতো। এই অমোঘ টানের জন্নেই হয়তো আজ বেরিয়ে পড়লাম কালনার উদ্দেশে। 


সকাল ০৮:০০

কোথাও যাওয়ার হলে আমি একটু টেনশনে ভুগি তাই বোধহয় স্টেশনে একটু আগেই পৌঁছে যাই, এবারও তার অন্যথা হলনা। টিকিট কেটে ৩নং প্ল্যাটফর্মে গিয়ে শুনলাম ট্রেন সেই ৮:৪০ এ, অতকিম বসে বসে লোক দেখা ছাড়া কাজ নেই। যাইহোক ভারতীয় রেল তার টাইম মতো এলো, আর আমিও সওয়ার হলাম ট্রেনে। ইতিউতি দেখে একটু বসার জায়গা পেলাম, অতএব চিন্তার ঘোড়া দৌড়াতে লাগলো আপনমনে। কালনা সম্পর্কে অনেক কিছুই শুনেছি পড়েছি, আজ দেখতে পাবো ভেবে আনন্দ হচ্ছে খুব। ভাবতে লাগলাম কোথায় কোথায় কি কি দেখবো?

সকাল ০৯:৫০
আরও অনেকের সাথে আমিও নেমে পড়লাম কালনা স্টেশনে। স্টেশনের বাইরে এসে দেখি অনেক রিকশা আছে, অতএব যাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া গেলো। কিন্তু মন যে বড় চা চা করছে, সুতরাং জনৈক চায়ের দোকানে গমন আর চা পান শেষে রিকশার জন্নে তারাহুড়ো। একটি রিকশার সাথে ১৫০ টাকাতে চুক্তি হল যে সে আমাকে রাজবাড়ী কমপ্লেক্স, ১০৮ শিব মন্দির আর কয়েকটি দর্শনীয় মন্দির ঘুরিয়ে আবার স্টেশনে এনে দেবে। রিকশা ওলা বেশ ইয়ং, নাম জিজ্ঞেস করাতে বলল – আমার নাম বিকাশ দাদা।  চেপে বসলাম রিকশা তে, প্রথম গন্তব্য রাজবাড়ী কমপ্লেক্স। এই ফাঁকে জানিয়ে রাখি কালনা সম্পর্কে কিছু কথা, ঐটিহাসিক বা উইকিহাসিক কোনটাই আমি নই, তাও যতটুকু তথ্য সংগ্রহ করেছি তা হল এই – পুন্যসলিলা ভাগীরথীর পশ্চিম কুল, বারানসি সমতুল, আর অম্বিকা কালনা বা শ্রীপাট কালনাও যে একটি প্রাচীন এবং বর্ধিষ্ণু জনপদ ছিল এটা বলা বাহুল্য। পঞ্চদশ, ষোড়শ শতকে এই স্থানের উল্লেখ আছে আম্বুয়া বাঁ অম্বুয়া মুলুক হিসাবে। অনেকের অনুমান, অম্বুঋষির আশ্রম স্থল হিসাবে স্থানটি প্রসিদ্ধিলাভ করেছিল অম্বিকা নামে।বৃন্দাবন দাস তাঁর চৈতন্য ভাগবতে অম্বিকা কালনাকে উল্লেখ করেছেন – “এই মতে সপ্তগ্রামে অম্বয়া মুলুকে। বিহরেন নিত্যানন্দ পরম কৌতুকে”। এছাড়া জানা যায় অম্বিকা কালনা তৎকালীন সময়ে ব্যবসা বাণিজ্যের জন্নেও বিখ্যাত ছিল, এখান থেকেই নদীপথে চাল, ডাল যেত।  

রিকশা এসে দাঁড়ালো রাজবাড়ী কমপ্লেক্সের সামনে, রিকশাওলা বলল – যান ভিতরে অনেক মন্দির আছে, দেখে আসুন, আর এর সামনেই ১০৮ শিব মন্দির, আপনি ঘুরে দেখুন আমি বসে আছি। আমি ঠিক আছে বলে ভিতরে এসে হতবাক। কি সুন্দর সাজানো গোছানো ভিতরটা। সামনেই প্রতাপেশ্বর শিবমন্দির, মহারাজ প্রতাপচাঁদের প্রথমা মহিষী রানী প্যারী কুমারি দেবী ১৮৪৯ সালে এই মন্দিরটি নির্মাণ করান। সুন্দর টেরাকোটার অপরূপ কারুকার্যে খচিত এই মন্দিরের গাত্র।

এই মন্দিরের ঠিক পাশেই আছে একটি ছাদবিহীন রাসমঞ্চ, এটি দেখে সামনে এগিয়ে এসে একটি ফটকের মধ্য দিয়ে ঢুকলেই চোখে পড়ে পঁচিশ চূড়াবিশিষ্ট বিশালাকার মন্দিরটি। এটি লালজি মন্দির নামেই বেশি পরিচিত, মন্দিরের সামনে আছে একটি নাট মণ্ডপ আর একটি পর্বতাকৃতি যা গিরিগোবর্ধন নামে পরিচিত। মুল মন্দিরটি টেরাকোটার অপরূপ অলঙ্করণে সুসজ্জিত।

১৭৩৯ খ্রিস্টাব্দে মহারাজা কীর্তিচাঁদ তার মাতা ব্রজকিশোরী দেবীর অনুরোধে তৈরি করান এই মন্দির টি। রাজবাড়ী কমপ্লেক্সে অন্যতম প্রাচীন মন্দির এটি, এর স্তাপত্য শিল্প সত্যি অসাধারন। পঁচিশরত্ন বা চুড়াবিশিষ্ট (Panchabimsati Ratna) পোড়ামাটির অনুপম টেরাকোটার কাজে সুশোভিত মন্দির টি বাংলার মন্দির শিল্পে এক অনবদ্য সংযোজন। এই ধরনের মন্দির বাংলায় খুব একটা বেশি নেই। 
          
মন্দিরে স্থাপিত শ্রীকৃষ্ণ বা লালজির বিগ্রহ নিয়ে একটি কাহিনি প্রচলিত আছে আজও। একদিন মহারাজা কীর্তিচাঁদের মাতা ব্রজকিশোরী দেবী গঙ্গাস্নান সেরে উঠে ঘাটে দেখলেন, একজন বৈষ্ণব সাধক তার ভিক্ষালব্ধ অল্প চালের ভোগ দিচ্ছে লালজি কে। তখন রাজমাতা ব্রজকুমারী দেবী বললেন, ‘সামান্য এই ভোগের অন্নে লালজির কি পেট ভরবে? এক কাজ করো। আমি রাজমাতা। তুমি বরং লালজিকে দাও আমায়। আমি তোমায় কথাদিচ্ছি, পুরুষোত্তমে প্রভু জগন্নাথ দেবের মতো আমিও প্রতিদিন বাহান্নভোগ নিবেদন করব লালজিকে’। একথা শুনে হেসে সেই বৈষ্ণব সাধক বললেন - মা, ভোগ প্রাচুর্যে কি কখনও ভগবান তুষ্ট হন? কখনও এক মুঠি ভোগান্নে তুষ্ট হন তিনি, কখনও ইচ্ছে না হলে কিছুই গ্রহন করেন না তিনি। তবে ভক্তের নিবেদিত অন্তরের একান্ত আন্তরিক শ্রদ্ধার্ঘ আকুতিভোগই যে গ্রহণ করেন তিনি”। যাইহোক, পড়ে কোন কারনে ওই বৈষ্ণব সাধক শ্রীকৃষ্ণের সুদর্শন বিগ্রহটি অর্পণ করেন রাজমাতা কে, সেই থেকে আজ ওই বিগ্রহ নিত্যসেবা আর পুজা পেয়ে আসছে। পরে অবশ্য শ্রী রাধিকার বিগ্রহ স্থাপন করা হয় শ্রীকৃষ্ণ বিগ্রহের পাশে। তবে কালের নিয়মে আজ আর সেই ভোগপ্রাচুর্য  নেই।  

এরপর আরও একটি মন্দির, পঞ্চরত্ন মন্দির (পাঁচটি শিব মন্দির) দেখে দেখতে এলাম কৃষ্ণচন্দ্র মন্দির। রাধাকৃষ্ণের সুদর্শন যুগলবিগ্রহে মন্দির জমজমাট, আলোকিত, এই মন্দিরটিও পঁচিশরত্ন শৈলীতে নির্মিত। ১৭৫১ খ্রিস্টাব্দে বর্ধমানের মহারাজা ত্রিলোকচন্দ্র রাজমাতা রাজলক্ষ্মী দেবীর উদ্দেশ্যে এই মন্দির নির্মাণ করান।চোখ জুড়ানো টেরাকোটার অলঙ্করণ চোখে না দেখলে বিশ্বাস হবেনা যে এতো সুন্দর মন্দিরটি। এই রাজবাড়ী কমপ্লেক্সে অবশ্য শুদু রাধা কৃষ্ণের মন্দিরই নয় এছাড়াও  বিজয় বৈদ্যনামে একটি বিশাল শিবমন্দির রয়েছে কৃষ্ণচন্দ্র মন্দির অঙ্গনের পূর্বভাগে। অনুপম স্থাপত্য শিল্পকলায় এই মন্দিরের আকর্ষণে ঘাটতি নেই এতটুকুও। মহারাজা ত্রিলোকচন্দ্র মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন পিতা কুমার মিত্রসেন রায় ও মাতা রাজলক্ষ্মী দেবীর উদ্দেশে। এছাড়া বদ্রিনাথ মন্দির ঘুরে দেখলাম, এক জায়গায় মনে হল রান্নাঘরই হবে, সেখানে একজন পেটমোটা বাউন বসে বসে রান্না করছে আর তাঁকে একজন সিরিঙ্গে মতো লোক সাহায্য করছে – অদ্ভুত কম্বিনেশন দুজনায়, যাই হোক কৌতূহল বশত উকি দিয়ে দেখলাম – বেগুন ভাজা, লুচি, ডাল হয়েছে, মনে হয় ভোগের রান্না। দেবতার ভোগে নজর দেওয়া মানা, তাই মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে চলে এলাম। 
  
মোটামুটি সব কটি মন্দির দর্শন ই হল, এবার ১০৮ শিব মন্দির দেখতে যেতে হবে, বাইরে এসে খোঁজ করলাম, বিকাশ মানে আমার রিকশাওলা আছে কিনা। দেখি বসে আছে, আমায় দেখে বলল – যান দাদা শিব মন্দির দেখে আসুন আমি তারপর অন্য মন্দিরে নিয়ে যাবো।

অতএব ঢুকে পড়লাম ১০৮ শিব মন্দির দেখতে, ১৮০৯ খ্রিস্টাব্দে এই শিবমন্দির গুলি নির্মাণ করান মহারাজা তেজচন্দ্র। এককেন্দ্রিক বৃত্তাকারেই সাজানো মন্দিরগুলি। এগুলির সংস্থান বিশেষভাবে লক্ষ্য করার মতো। বিশাল বিস্তৃত গোল অঙ্গন ঘিরে চক্রাকারে প্রথম একসারি মন্দির, তারপর ভিতর দিকে আবার চক্রাকারে একসারি শিবমন্দির। বাইরের বৃত্তে সাদা ও কালোরঙের শিবলিঙ্গসহ ৭৪টি এবং ভিতরের বৃত্তে রয়েছে ৩৪টি মন্দির। আটচালা শৈলীতে নির্মিত এই মন্দিরগুলিকে উঁচু জায়গা থেকে দেখলে মনে হবে পাপড়ি মেলা পদ্ম। ভিতরে কিছুক্ষণ ঘুরে সব দেখে ছবি তুলে নিয়ে বাইরে এলাম।

দুপুর ০১:৩০
বেরিয়ে এসে বিকাশের খোঁজ করতে দেখি – বসে বসে দুজনের সাথে তাস খেলছে। আমায় দেখে বলল – দাদা এখানেই তো ০১:৩০ বাজিয়ে দিলেন, বাকী মন্দির দেখতে গেলে তো সন্ধে করে দেবেন দেখছি। সারাদিনে এই একটা ত্রিপ খাটলে আমার চলবে? কি আর বলব দোষ আমার মুগ্ধ হয়ে যত দেখেছি, ঘড়ির কাঁটা তত দৌড়েছে, আর আমি বুজতে পারি নি। বললাম – চলো বাকী কয়েকটা মন্দিরে, আমার জন্নে তোমার লস হবে না, আমি ঠিক পুসিয়ে দেবো। চলো এবার বাকী মন্দির গুলো চলো, রিকশা একটু বাদে এলো কালনার সবচেয়ে বিখ্যাত আর পবিত্র মন্দির - সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরের দোরগোড়ায়। কিন্তু বিধি বাম, কি একটা পুজা থাকার জন্নে বিশাল ভিড় মন্দির চত্বরে। অতএব আর কি বাইরে থেকে মন্দিরের প্রবেশ পথের ছবি তুলে আবার এগিয়ে গেলাম পরবর্তী মন্দিরে সন্ধানে।

সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরের ইতিহাস বলতে আমি যা জানি তা হল এই – রাজা কীর্তি চন্দ্রের পুত্র ছিলেন চিত্রসেন রায়, নিজগুনে আর দক্ষ প্রশাসনের গুনে তৎকালীন বাংলা সুবার নবাব ও দিল্লীর সম্রাটের প্রিয় ছিলেন তিনি। আর এরজন্নেই হয়তো ১৭৪১ খ্রিস্টাব্দে ‘রাজা’ উপাধি লাভ করেন। একদিন রাজা চিত্র সেন নবদ্বীপের উদ্দেশে ঘোড়ায় চেপে যাচ্ছিলেন, জঙ্গলের মাঝে তার কানে ঘণ্টাধ্বনি আসায় আরও গভীর জঙ্গলে ঢুকে প্রত্যক্ষ করেন জনমানবহীন একটি প্রাচীন মন্দির। মন্দিরের গর্ভগৃহে তিনি দেখেন মা কালীর বিগ্রহের সামনে থরে থরে সাজানো আছে পুজার নানবিধ উপকরন। প্রাসাদে ফিরে আসার পর, ১৭৩৯ খ্রিস্টাব্দে প্রাচীন ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দিরক্ষেত্রেই নতুন মন্দির নির্মাণ করে নিত্যপুজোর ব্যবস্থা করেন রাজা।

এর পর দেখলাম গোপাল জিউ-র মন্দির, এটিও পঁচিশরত্ন বা চুড়াবিশিষ্ট (Panchabimsati Ratna) পোড়ামাটির অনুপম টেরাকোটার কাজে সুশোভিত মন্দির। এটি ১৭৬৬ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত হয়েছিলো।  মন্দির চত্বরে সুসজ্জিত কাঠের তৈরি রথ দেখে একজন কে জিজ্ঞেস করায় জানতে পারলাম যে রথে খুব ধুমধাম করে রথ টানাও হয়। এরপর দেখতে এলাম অনন্ত বাসুদেব মন্দির। এটি সম্প্রতি সংস্কার হয়েছে, তাই এর পুরাতন রুপ আর নেই। বিগ্রহ দর্শন করে ফিরে আসছি, এমন সময় ডাক শুনে ফিরে দেখলাম – একজন বৃদ্ধা ভদ্রমহিলা বলছেন – বাবা একটু প্রসাদ মুখে দিয়ে যাও। এতো আন্তরিক ভাবে বললেন যেন কতদিনের চেনা। আমি বললাম – হ্যাঁ ঠাকুমা দিন প্রসাদ দিন। কথায় কথায় জানতে পারলাম উনি এই আশ্রমেই থাকেন, মন্দিরের কাজকর্ম করেন আর গোপালের সেবা করেন। জানতে চাইলাম বাড়ী যান না? ঠাকুমা বললেন – যাই বাবা মাঝে মধ্যে, তাও কমই। আসলে গোপাল কে ছেড়ে থাকতে পারি না। ভক্তির পরাকাষ্ঠা বোধহয় এরকমই হয়। একটু বসে ওনার দেওয়া প্রসাদ (গুজিয়া) আর জল খেয়ে ওনার থেকে বিদায় নিলাম। ফিরে আসার সময় ঠাকুমা বললেন – আবার এসো বাবা, ফিরে আসার সময় দেখি দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন।
ফিরে এসে বিকাশ কে জিজ্ঞেস করলাম আচ্ছা বাকী মন্দির দেখতে আরও কত সময় লাগবে। বিকাশ বলল – আরও প্রায় ঘণ্টা দুই ধরতে পারেন।

ঘড়ি দেখে দেখলাম অনেক দেরি হয়ে যাবে, তাই মন না মানলেও বললাম – আর দেখবো না বিকাশ চলো স্টেশনে ফিরে যাই। যাবার সময় কোন একটা খাবার দোকানে একটু দাঁড়িয়ো, একটু খেয়ে নেব। তুমিও তো খাওনি, তাই আমার সাথে কিছু খেয়ে নিয়ো। বিকাশ বলল – দাদা আপনি যখন ১০৮ শিব মন্দির দেখছিলেন, আমি বাইরে খেয়ে নিয়েছি, তাই আপনি একাই খেয়ে নেবেন। চলুন আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসি, তারপর কি মনে হওয়াতে বলল – আচ্ছা দাদা আপনি আমাদের এখানকার মাখা সন্দেশ খেয়েছেন কখনও? আমি বললাম – না ভাই আজই তো প্রথম এসেছি এখানে। বিকাশ বলল – দাদা অল্প করে নিয়ে যান, মুখে লেগে থাকবে টেস্ট। আমি আপনাকে ভালো দোকান দেখে নিয়ে যাচ্ছি, কিনে নিয়ে যান বাড়িতে সবাই ভালো বলবে। যেতে যেতে একটা মিষ্টির দোকান দেখে বলল – যান দাদা নিয়ে নিন, আমি বলে দিচ্ছি। বলে চেঁচিয়ে বলল - দাদা কে একটু ভালো দেখে মাখা সন্দেশ দেবেন, দাদা নিয়ে যাবেন। আমি বেশ খানিকটা মাখা সন্দেশ কিনে, আর গোটাকয়েক রসগোল্লা কিনে ফিরলাম। রসগোল্লা বিকাশ কে দিয়ে বললাম  - এটা তুমি খেও, আজ অনেক্ষন তুমি আমার সাথে ঘুরে ঘুরে সব দেখালে, তাই এটা আমার গিফট তোমাকে। বিকাশ হেসে বলল – দাদা এটা আবার দিলেন কেন? আবার চড়ে বসলাম রিকশা তে, এগিয়ে চলল রিকশা স্টেশনের দিকে। বিকাশ বলল প্রায় সোয়া তিনটে বাজে, এখন কি আপনি গরম ভাত ডাল কিছু পাবেন?  আমি বললাম – ভাই তোমাদের এখানে ভালো চায়ের দোকানে নিয়ে চলো তাহলেই হবে। ও আমি ডিমটোস্ট আর চা খেয়ে নেব। বাস স্ট্যান্ডের কাছাকাছি এসে বিকাশ বলল – দাদা আপনি এই দোকানে খান, এ মোটামুটি ভালোই করে। আমি বিকাশকেও আসতে বললাম কিন্তু ও বলল দাদা শুদু চা খাবো আর কিছু খাবো না। অতএব একটা ডিম টোস্ট আর দুটো চা বলে বসলাম বেঞ্চে। বিকাশ কে জিজ্ঞেস করলাম – আচ্ছা এখানে মহাপ্রভু বাড়ী তাও তো খুব বিখ্যাত না? বিকাশ বলল – দাদা এখানে জগন্নাথ বাড়ীর শিব মন্দির, ভবা পাগলার মন্দির, দাতন কাঠি মসজিদ দেখতেও লোক আসে দূর দূর থেকে। হেসে বললাম – নেক্সট বার এলে তুমি এগুলো নিয়ে যাবে তো আমায়। বিকাশ বলল – হ্যাঁ দাদা নিশ্চয়ই নিয়ে যাবো। এর মধ্যেই গরম গরম ডিম টোস্ট আর চা এসে হাজির, খবার দেখে খিদে টা জাগান দিয়ে উঠল। খেয়ে দেয়ে, দোকানীর হিসেব মিটিয়ে যখন বাইরে এলাম তখন ঘড়িতে প্রায় চারটে বাজছে। বিকাশ বলল – চলুন দাদা এসেই গেছি আপনি ৪:২৫ এর ট্রেন টা পেয়ে যাবেন। আপনার টিকেট কাঁটা আছে তো? আমি বললাম – হাঁ রিটার্ন কেটেই এসেছি। একটু বাদে স্টেশনে পৌঁছে গেলাম।
           
নেমে বিকাশ কে ২৫০ টাকা দিয়ে বললাম ভাই কম হোল নাতো? বিকাশ বলল না না দাদা ঠিকই আছে, এতো বেশি দিলেন কেন? আমি বললাম – না আজ তুমি অনেক্ষন আমার সাথে ছিলে তাই এটা তোমার প্রাপ্য। বিকাশ বলল – দাদা আবার আসবেন, আমি এখানেই রিকশা নিয়ে থাকি।

আবার আসব এই বলে স্টেশনে এগিয়ে গেলাম, পিছনে পরে রইল রূপসী কালনা। মনে মনে ঠিক করলাম বাকী মন্দির ও দ্রষ্টব্যস্তান গুলি দেখতে খুব শিগগিরি আবার আসব কালনা তে। আমরা মন্দির নগরী বলে বিষ্ণুপুর কে জানি, কিন্তু কালনা কোন অংশে কম নয় বিষ্ণুপুরের চেয়ে। ঐতিহ্যে, গরিমায় অনায়সে ঠাই পেতে পারে বাংলার পর্যটন মানচিত্রে। শুদু দরকার সরকারের একটু সদিচ্ছা আর ঠিকঠাক প্রচার, তাহলেই পর্যটকের ঢল নামবে এই সুন্দর জায়গাটিতে।
  

কিভাবে যাবেন?

হাওড়া – কাটওয়া শাখার ট্রেন ধরে সরাসরি নামতে পারেন কালনা স্টেশনে। নেমে রিকশা করে ঘুরে নিতে পারেন সুন্দর সুন্দর মন্দির আর বিভিন্ন দ্রষ্টব্য স্থান গুলি। তবে আমি অবশ্যই অনুরোধ করব – কালনার মাখা সন্দেশ আর মিষ্টি চেখে দেখতে। আমি শিওর যে কালনার মিষ্টি আপনার মন জয় করবেই।
      
কালনার ছবি দেখার জন্নে অনুরোধ করব নীচের লিঙ্কে visit করতে