Tuesday, 8 November 2016

অন্নদাতা সুখী ভব?


অন্নদাতা সুখী ভব?

কোনোমতে ট্রেনে উঠে ঠেলে থুলে ভিতরে এসে অভ্র দেখলো না তাঁদের গ্রুপের সবাই হাজির। সুরজিত গালাগালি দিয়ে বলল – শালা তাড়াতাড়ি বাড়ী থেকে বেরোতে পারিস না? ওইভাবে দৌড়ে কেউ ট্রেনে ওঠে? খসে যাবি তো বাবা। নে বস একটু জিরিয়ে নে। অভ্র কোনও কথা না বলে একটু হেঁসে বসে পড়ল, আসলে আজ তার মন টা ভালো নেই। অফিসে বেরোনোর আগে মধুমিতা মানে বউয়ের সাথে ঝগড়া করে বেড়িয়েছে সে। মধুমিতার আবদার এবারে তাঁকে কোথাও বেড়াতে নিয়ে যেতেই হবে, নইলে একটা বড় অ্যান্ডয়েদ ফোন চাই তার। তার সব বন্ধুর আছে, এই কি প্যাড দেওয়া ফোন আর চলছে না। মেয়ের গানের স্কুল থেকে বলে দিয়েছে একটা স্কেলচেঞ্জার হারমোনিয়াম কিনে দিতে, মেয়েটা ভালই গায় অভ্রর। অভ্র হিসেব কষে দেখেছে প্রায় ১৮-২০হাজার টাকার ধাক্কা, সে বেসরকারি ফার্মের অল্প মাইনের চাকুরে, হট করে এত টাকার ব্যাবস্থা করে কিভাবে? এই কথাটাই মধুমিতা কে বোঝাতে গিয়ে ঝগড়ার সৃষ্টি, ফলস্বরূপ লেটে স্টেশনে আসা। চিন্তা সুত্র ছিঁড়ে গেলো বিকাশের খোঁচায়, বিকাশ ফিসফিস করে বলে – এই কি এত ভাবছিস রে? শোন আজও দেবুদা আমাদের সবার কাছে ১০০০ টাকা ধার চেয়েছিল, আমরা কাটিয়ে গেছি। তোর কাছে চাইলে একদম দিস না। মালটা ফেরত দিতে ভোগাবে। বলতে বলতে উল্টোদিকের সিট থেকে দেবুদা মুখ বাড়িয়ে বলল – কি আজ লেটে কেন? শরীর ঠিক আছে তো? অভ্র মনে মনে বলল – ভ্যান্তারা ছেড়ে ঝেড়ে কাশও বাবা, মুখে বলল – না এই লেট হয়ে গেলো, আপনি কেমন আছেন দেবুদা? দেবুদা মুখ টা কাঁচুমাচু করে বলল – ভাই ভালো নেই, একটু টানাটানির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি, টা তোমার কাছে ১০০০ টাকা হবে, এই মাইনে পেয়েই দিয়ে দেবো কিচ্ছু ভেবনা। অভ্র বলল- না দাদা এখন তো হবে না, আপনি অন্য কার কাছে একটু্ দেখে নিন। দেবুদা শুকনো মুখে বসে পড়ল। পাশ থেকে অজয় বলল – শালা আবার পেট্রলের দাম ২৮ পয়সা বাড়ল, না দেখছি বাইকে চাপাই ছেড়ে দিতে হবে, মনে হচ্ছে সাইকেলেই স্টেশনে আসতে হবে এবার। নির্মলদা ফুট কাটল – এত সবে কলির সন্ধে, শুনছি গ্যাসের দাম ও বাড়বে। প্রতাপদা ওপাশ থেকে বলল – অচ্ছে দিন অ্যা গয়ে, বুজলে ভাই সাংসদদের মাইনে বাড়ছে। শুনে অজয় কাঁচা খিস্তি দিয়ে বলে উঠলো – ওই হোক, আর আমাদের যে গত ৪ বছরেও স্যালারি বাড়েনি সেটার খোঁজ কে রেখেছে? কি বল অভ্র তোমাদের বেড়েছে? অভ্র শুকনো মুখে বলল – আর মাইনে বাড়ানো? চাকরি থাকবে কিনা কে জানে? 

(না নিছক কোনও গল্প লিখতে আমি বসিনি, হয়তো আসা যাওয়ার পথে এধরনের বারোমাস্যা আমরা শুনেই থাকি। মূল্যবৃদ্ধি আজ জ্বলন্ত সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, কিন্তু এই নিয়ে কি কোনও প্রতিবাদ, আন্দোলন হয়? আমরা সীমান্ত সমস্যা, পাকিস্থান, হরেক উৎসব-মেলা নিয়ে মেতে আছি, টিভিতে আইপিএল, সিরিয়াল বিনোদনের কত কি? কিন্তু প্রদীপের নিচের অন্ধকার নিয়ে আমরা ভাবি না। প্রতিবাদের ভাষা আজ আমরা হারিয়ে ফেলেছি, আমাদের সামান্য স্বপ্ন - দুবেলা পেট পুরে অন্ন,  সুস্বাস্থ,  সুরক্ষিত একটা ছাদ,  পরনের বস্ত্র ও শিক্ষা। কিন্ত সেটুকুও চাওয়া বা পাওয়ার আশা রাখা যেন স্বপ্নের অতীত। সাধারণ আম আদমি খবরের কাগজে গ্যাসের দাম, পেট্রোল ও ডিজেলের দাম, নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়ার খবরে চমকে ওঠে, ভাবে এই স্বল্প আয়ে কিভাবে চালাবে সংসার? ঝাঁ চকচকে ভারতের ভিতরে অনুজ্বল, ম্যাড়ম্যাড়ে একটা ভারত আছে সেটা কজন খোঁজ রাখে? যা চকচকে শপিং মল, মাল্টি প্লেক্স, রেস্তোরাঁ এসব দিয়ে ভারত কে বিছার করতে গেলে আমরাই ঠকে যাব। খেটে খাওয়া শ্রমজীবী প্রান্তিক মানুষের কথা কবে বুজবে জনদরদি নেতা ও নেত্রীবৃন্দ? একটু দেখে নেওয়া যাক জনতার ভোটে জিতে আসা জনতা জনার্দনরা সব কেমন আছেন? ভারতে একজন এমপি সারাবছরে – ৬ লাখ টাকা মাইনে, প্রতিদিন ২০০০ টাকা সংসদে হাজিরার জন্যে, ৫.৪ লাখ টাকা অফিস ও তার কর্মীর খরচ খরচা বাবদ পেয়ে থাকেন। এছাড়া অন্য সুবিধা গুলি হল – বিনা খরচে বাসস্থান, জল, চিকিৎসা ও ফোনের সুবিধা। ৩৪ টি প্লেনে যাতায়াতের সুবিধা, রেলে যাতায়াতের পাস। এছাড়াও এনাদের পরিবারও এই ধরনের সুবিধা পেয়ে থাকেন। আর খোদা না খাস্তা, যদি পাঁচ বছরের পরে গদি না জুটলেও, পেনশন, অন্যান্য সুযোগ সুবিধা তো আছেই। কেউ একবার বলেছিল রাজনৈতিক নেতারা দেহত্যাগ না করলে গদিত্যাগ করেন না, সুতরাং পাঁচ বছর পরে রিটায়ারমেন্তের গল্প দূর অস্ত। বেস কয়েক বছর আগে একবার শুনেছিলাম তৎকালীন কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান মন্টেক সিং আলুওয়ালিয়া সুপ্রিম কোর্টে হলফনামা পেশ করে বলেছেন, গ্রামে মাথাপিছু  প্রতিদিন ১৫ টাকা ও শহরে মাথাপিছু প্রতিদিন ২০ টাকা খরচ করতে পারলে পুরোপেট পুষ্টিকর খাবার পাওয়া যায়। চমৎকার স্যার ঠাণ্ডা ঘরে বসে এর থেকে ভালো আইডিয়া আসতে পারে না, জানিনা আজও এই রেটই বহাল আছে কিনা? আর একটি কথা জানলে হয়তো হাসি পাবে – আমাদের দেশে সবথেকে সস্তায় পুষ্টিকর খাবার পাওয়া যায় সংসদ ক্যান্টিনে। হ্যাঁ এটা সত্যিই, কিছুদিন আগেও সাংসদরা যারা এত কম আয় করেন, যে তাঁরা এক প্লেট ‘ফ্রায়েড ফিশ উইথ চিপস’ কিনতেন মাত্র ২৫ টাকায়। মাটন কাটলেট পেতেন আরও কমে, মাত্র ১৮ টাকায়। মশলা দোসা ৬ টাকায়! একবার ওই ক্যান্টিনে মধ্যাহ্নভোজন সেরেছিলেন খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ভাত, রুটি, রাজমা, সার্সো কা সাগ, আলুর তরকারি আর দই খেয়ে তাঁকে দিতে হয়েছিল ২৯ টাকা। সংসদের ক্যান্টিনে ২০০৯-১০ অর্থবর্ষে ১০ কোটি ৪০ লক্ষ, ২০১০-১১-এ ১১ কোটি ৭০ লক্ষ, ২০১২-১৩ সালে ১২ কোটি ৫০ লক্ষ এবং ২০১৩-১৪ সালে ১৪ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে কেন্দ্র। হিসেব বলছে, ভেজিটেবল স্ট্যু তৈরির উপকরণের বাজারদর প্রায় ৪২ টাকা। আর সেই খাবার মাত্র ৪ টাকায় কিনেছেন সাংসদেরা। অর্থাৎ ভর্তুকির পরিমাণ প্রায় শতকরা ৯০ শতাংশ। এরপরেও আমাদের নেতৃবৃন্দ গ্যাসের উপর ভর্তুকি ছেড়ে দিতে আবেদন করবেন? সেন্টিমেন্তে সুড়সুড়ি দেওয়া লোভনীয় বিজ্ঞ্যাপনে কেন দেখতে হবে ভর্তুকি ছাড়া কেন উচিত? যেখানে মাছ, মাংস হোক বা ভাত-রুটি-বিরিয়ানি— সংসদের ক্যান্টিনে খাবার পাওয়া যায় সুলভে/ ভর্তুকিতে। জানিনা এখন এই চিত্রের পরিবর্তন এসেছে কিনা? মূল্যবৃদ্ধি রোখার পরিবর্তে এই ধরনের ক্যান্টিন দেশের সব জায়গায় খুলে দিলে আম আদমি চারবেলা পেট পুরে খেতে পারে।
 
মাফ করবেন আমি মাননীয় সাংসদদের অবমাননা করে কিছু বলছি না, ওনারা দেশের পথ প্রদর্শক, উন্নতির, আধুনিক ভারতের রূপকার ওনারা না হয় একটু সুযোগ সুবিধা ভোগ করলেন তাতে ক্ষতি নেই। কিন্তু এই আমরা মিডল ক্লাস মধ্যবিত্ত বা সমাজের নীচের তলার মানুষের কথা যদি একটু ভাবেন তাতে ক্ষতি কি? তাহলে প্রতিদিন তিল তিল করে যে যন্ত্রণা ভোগ করছি আমরা তার কিছু সুরাহা হয়। আজকাল তো নিউজ পেপারের পাতা উল্টালেই দেখা যায় অমুক শিল্পপতি, প্রভাবশালী ব্যাবসায়ি কর ফাঁকি, পিএফের টাকা, গ্রাচুইতির টাকা মেরে দেয়, ব্যাংকের পাওনা টাকা মেরে বিদেশে চলে যায়, চাপে পড়ে সাধারণ মানুষ। যেখানে ন্যায্য মজুরি, মাহিনা মেলে না, সেসব বেসরকারি ক্ষেত্রে একটু দৃষ্টিপাত করলে ভালো হয়। ২০১৬-র মে মাসের সরকারি পাইকারি মূল্য সূচক এবং সরকার প্রকাশিত বছর ভিত্তিক মুদ্রাস্ফীতির হারে দেখা যাচ্ছে, ডালে ৩৫.৫৬ শতাংশ, সবজিতে ২২.৯২ শতাংশ ও চিনিতে ২২.৩ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে। এরই সঙ্গে সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে খাদ্যপণ্যে মুদ্রাস্ফীতির হার ৮ শতাংশেরও বেশি, যদি আমার দেওয়া তথ্যে ভুল থাকে সংশোধন কাম্য। আমাদের রোজকার খাদ্যদ্রব্য ডালের দাম আজ আকাশছোঁয়া। দেশে বেকারত্ব বাড়ছে, কমছে কর্মসংস্থান। এমতাবস্থায় পরিত্রাণের পথ নিশ্চয়ই আমাদের মাননীয় নেতা ও নেত্রীবৃন্দই দেখাবে? হাজার হোক আপনারাই আমাদের প্রকৃত অন্নদাতা। আশা করব আমাদের এই আর্জি সহমর্মিতার সাথে বিবেচনা করা হবে, দেখবেন রাষ্ট্রদ্রোহী বলে তকমা লাগিয়ে দেবেন না যেন? জয় হোক নতুন ভারতের ও আমাদের নেতৃবৃন্দের - অন্নদাতা সুখী ভব।

Monday, 7 November 2016

চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজো, আর কিছু কথা


চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজো, আর কিছু কথা

শুরু হয়ে গিয়েছে ঐতিহ্যের শহর চন্দননগরে জগদ্ধাত্রী পুজো, কৃষ্ণনগর না চন্দননগর মা জগদ্ধাত্রীর আরাধনায় কে এগিয়ে এই তর্ক আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। কিন্তু এই দুই জায়গার সাথে আজ একাত্ম হয়ে গেছে জগদ্ধাত্রী পুজোর চিরন্তন ঐতিহ্য।

পুরাণের পাতায় উকি দিয়ে একটু দেখে নেওয়া যাক কিছু তথ্য - জগদ্ধাত্রী শব্দের আভিধানিক অর্থ "জগৎ+ধাত্রী। জগতের (ত্রিভুবনের) ধাত্রী (ধারণকর্ত্রী, পালিকা)"। একবার ইন্দ্র, অগ্নি, বায়ু ও চন্দ্র – এই চার দেবতা এমন অহংকারে মত্ত হয়ে ভুলে যান যে তাঁরা দেবতা হলেও তাঁদের স্বতন্ত্র কোনও শক্তি নেই – মহাশক্তি দেবী দুর্গার শক্তিতেই তাঁরা বলীয়ান। এই দেবগণের ভ্রান্তি দূর করতে দেবী জগদ্ধাত্রী কোটি সূর্যের তেজ ও কোটি চন্দ্রের প্রভাযুক্ত এক দিব্য মূর্তিতে তাঁদের সম্মুখে উপস্থিত হলেন। এরপর দেবী প্রত্যেকের সম্মুখে একটি করে তৃণখণ্ড রাখলেন; কিন্তু চার দেবতার কেউই তাকে স্থানচ্যুত বা ভষ্মীভূত করতে পারলেন না। তখন দেবগণ নিজেদের ভুল বুঝতে পারলেন। তখন দেবী তাঁর তেজোরাশি স্তিমিত করে এই অনিন্দ্য মূর্তি ধারণ করলেন। সেই মূর্তি ত্রিনয়না, চতুর্ভূজা, রক্তাম্বরা, সালংকারা, নাগযজ্ঞোপবীতধারিনী ও দেব-ঋষিগণ কর্তৃক অভিবন্দিতা এই মঙ্গলময়ী মহাদেবীর মূর্তিকে দেখে দেবগণও তাঁর স্তবে বসেন৷ মা জগদ্ধাত্রী দেবী দুর্গার অপর রূপ, উপনিষদে এঁর নাম উমা হৈমবতী। মা জগদ্ধাত্রী ত্রিনয়না, চতুর্ভূজা ও সিংহবাহিনী। তাঁর হাতে শঙ্খ, চক্র, ধনুক ও বাণ; গলায় নাগযজ্ঞোপবীত। বাহন সিংহ করীন্দ্রাসুর অর্থাৎ হস্তীরূপী অসুরের পৃষ্ঠে দণ্ডায়মান। দেবীর গাত্রবর্ণ উদিয়মান সূর্যের ন্যায়। কার্তিক মাসের শুক্লা নবমী তিথিতে দেবী জগদ্ধাত্রীর বাৎসরিক পূজা অনুষ্ঠিত হয়। হিন্দু ধর্মীয় মানসে রাজসিক দেবী দুর্গা ও তামসিক কালীর পরেই স্থান সত্ত্বগুণের দেবী জগদ্ধাত্রীর। ধ্যান বা স্তবমন্ত্রে উল্লেখ না থাকলেও জগদ্ধাত্রী প্রতিমায় বাহন সিংহের পদতলে একটি হস্তীমুণ্ড থাকে। প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে, মা জগদ্ধাত্রী করীন্দ্রাসুর অর্থাৎ মহাহস্তী রূপী অসুরকে বধ করেছিলেন। এই কারণে দেবী জগদ্ধাত্রী করীন্দ্রাসুরনিসূদিনী নামে পরিচিত। মা জগদ্ধাত্রীর পূজা অনুষ্ঠিত হয় দুর্গাপূজার ঠিক একমাস পর কার্তিক মাসের শুক্লা নবমী তিথিতে। কাত্যায়নীতন্ত্র-এ কার্তিকী শুক্লা নবমীতে দেবী জগদ্ধাত্রীর আবির্ভূত হওয়ার কথা আছে। সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী - এই তিন দিন জগদ্ধাত্রীর পূজা হয়ে থাকে।। কোথাও কোথাও প্রথম বা দ্বিতীয় পূজার পর কুমারী পূজারও আয়োজন করা হয়। দুর্গাপূজার ন্যায় জগদ্ধাত্রী পূজাতেও বিসর্জনকৃত্য বিজয়াকৃত্য নামে পরিচিত। এমনকি পুষ্পাঞ্জলি ও প্রণাম মন্ত্রসহ পূজার অনেক মন্ত্রও দুর্গাপূজার অনুরূপ।

এবারে একটু দেখে নেওয়া যাক চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজোর ইতিহাস – কথিত আছে ফরাসী সরকারের দেওয়ান ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী এই পুজোর প্রবর্তক। এ কথা বহুল প্রচলিত যে মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র আর ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরীর মধ্যে সখ্যতা এবং যোগাযোগ ছিল। এক বার কৃষ্ণচন্দ্রের বাড়িতে জগদ্ধাত্রী পুজো দেখে পরের বছর ইন্দ্রনারায়ণ চন্দননগরের লক্ষ্মীগঞ্জ চাউলপট্টির নিচুপাটিতে জগদ্ধাত্রী পুজো সূচনা করেন, এটিও চন্দননগরের আদি পুজো বলে পরিচিত। এখনও পর্যন্ত পুরুষানুক্রমে দেওয়ান চৌধুরীদের উত্তরপুরুষের নামে এই পুজোর সংকল্প হয়। তাই অনেকেই মনে করেন ইন্দ্রনারায়ণের মাধ্যমে কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পুজো চন্দননগরে প্রবেশ করেছিল।  যদিও এ কাহিনি নিয়ে মতান্তর আছে। কেননা, ইন্দ্রনারায়ণের মৃত্যু হয়েছিল ১৭৫৬ সালে। আর ১৭৫৬-এ কৃষ্ণনগরে পুজোর প্রচলন হয়েছিল কি না তা নিয়ে দ্বিমত আছে। অন্যমত হল – লক্ষ্মীগঞ্জ বাজারের তৎকালীন চালের ব্যবসায়ীদের মধ্যে কেউ কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পুজো দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে এই পুজোর প্রচলন করেন। ১৭৯০ সালে সার্বজনীন বা বারোয়ারী পদ্ধতিতে এই পুজোর প্রারম্ভ হয়। যদিও কাপড়ে পট্টির ব্যবসায়ীরা বলেন আনুমানিক ১৭৬৮ সাল থেকে এই পুজো হয়ে আসছে, এটা যদি সত্য বলে ধরে নেওয়া হয় তাহলে চাউলপটির থেকে এখানকার পুজো প্রাচীনতর। আবার এই জনশ্রুতি আছে যে - কৃষ্ণচন্দ্রের দেওয়ান দাতারাম শূরের হাত ধরে এই অঞ্চলে জগদ্ধাত্রী পুজোর প্রচলন ঘটে। দাতারামের বাড়ি ছিল ভদ্রেশ্বরের গৌরহাটি অঞ্চলে। এখানেই আনুমানিক ১৭৬২-র কাছাকাছি সময় দাতারামের বিধবা মেয়ে তাঁর বাড়িতে জগদ্ধাত্রী পুজো শুরু করেছিলেন। গবেষকদের মতে এ পুজোতেও কৃষ্ণচন্দ্রের অনুদান ছিল। পরে পুজোটি স্থানান্তরিত হয় শিবতলা অঞ্চলে। পরবর্তী কালে মূলত আর্থিক কারণে পুজোটি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলে গৌরহাটি অঞ্চলের বাসিন্দারা পুজোটির দায়িত্ব নেন, সেই পুজোটিই আজ তেঁতুলতলার পুজো বলে প্রসিদ্ধ। 

কয়েকটি ঐতিহ্যশালী জগদ্ধাত্রী পুজো - উত্তর চন্দননগরের লক্ষ্মীগঞ্জ চাউলপট্টি যা আদি মার পুজো নামেই অধিক বিখ্যাত। এখানকার প্রতিমার বৈশিষ্ট্য হল সনাতনরীতির প্রতিমায় সাদা সিংহ এবং বিপরীতমুখী অবস্থানে হাতি। জনশ্রুতি আছে বিসর্জনের সময় আদি প্রতিমা জলে পড়লেই শুশুক বা সাপের দেখা পাওয়া যায়। এছাড়া অবশ্য কাপড়েপট্টি, ভদ্রেশ্বরের গঞ্জের পুজো, গৌরহাটি তেঁতুলতলার পুজো খুবই জনপ্রিয় ও বিখ্যাত। এছাড়া বাগবাজার, ফটকগোঁড়া, বিদ্যালঙ্কা, হেলাপুকর, নাড়ুয়া, চারমন্দির তলা, হাটখোলা ইত্যাদি পুজোও দেখার মতো।

পুজোর সেকাল ও একাল – আমি একজন খুব প্রবীণ ব্যক্তির কাছে একবার তাঁদের সময়কার জগদ্ধাত্রী পুজোর কথা জানতে চেয়েছিলাম। উনি আমায় বলেছিলেন – জানো বাবা আজ চন্দননগরের আলোকসজ্জা তো আন্তর্জাতিক খ্যাতিলাভ করেছে, কিন্তু আমাদের সময়ে আলো বলতে থাকত পিতলের প্রদীপ, তাও জ্বলত মণ্ডপের ভিতর। রাস্তার দুপাশে থাকতো কিছু গ্যাস বাতি আর পেল্লায় সব প্রদীপ। কোনও কোনও জায়গায় হ্যাজাকের ব্যবহার ও হতো। আর তখন বিসর্জনের শোভাযাত্রায় জ্বালানো হতো মশাল, এছাড়া জেলেদের মাছধরার চিনেমাটির হাঁড়িতে ঘুঁটে কেরোসিন দিয়ে আগুন জ্বালানো হত। সেই হাঁড়িটি একটি বাঁশের মাথাকে চার ভাগে ভাগ করে নিয়ে তাতে বেঁধে দেওয়া হত। অনেক সময় শোভাযাত্রার সামনে থাকত সঙের দল, রামায়ণ মহাভারত, কৃষ্ণলীলা, মহাদেব, বহুরূপী সেজে শোভাযাত্রায় চলত নানা অভিনয়, ওড়ানো হত ফানুস। এমনকী  তৎকালীন ফরাসী সাহেবরাও নাকি সেই সময় মেতে উঠতেন জগদ্ধাত্রী পুজোর উৎসবে। সেই সময়ে প্রতিমা নিয়ে যাওয়া হত বাঁশের মাচায় কাঁধে চাপিয়ে। কি মনকাড়া বিবরন তাই না? আমরা অবশ্য যারা চন্দননগরে বড় হয়েছি এসব দেখতে পাইনি, তবে আমরা দেখেছি টুনি লাইটের অদ্ভুত কারুকার্য, ইলেকট্রিক পাখাকে মোটরে রুপান্তরিত করে কাঠের ছোটছোট যন্ত্র বানানো হতো, সেই মোটরের ঘ্যাঁস ঘ্যাঁস আওয়াজ আর টুনি লাইটের ঝিকিমিকি আজও মনে রঙ্গিন হয়ে আছে। পরবর্তীকালে অবশ্য এলইডি লাইট এসেছে, অনেক উজ্বল আর ঝকমকে কিন্তু টুনি লাইটের ঝিকিমিকি ভুলতে পারি নি আজও। তবে নানারকম খাওয়া দাওয়ার স্টল আজও একইরকম আছে, কি সব নাম সেই সব রেস্তোরাঁগুলির – উত্তম সুচিত্রা, দাদাবউদির রেস্তোরাঁ, দিল্লি দরবার আরও কত কি? আরও দেখতে পাওয়া যায় দূর দুরান্ত থেকে আগত বিভিন্ন রকমের জিনিসের মেলা, কাঠের পুতুল, বাঁশি, একতারা আজও পাওয়া যায় হাল ফ্যাশনের ইমিতেশন গয়নার, ইলেকট্রনিক, প্লাস্টিকের খেলনার পাশাপাশি। এই কটা দিন চন্দননগর ও পার্শ্ববর্তী এলাকা গুলি যথার্থ অর্থেই হয়ে ওঠে হাজারো মানুষের মিলনস্থল। একবার যাবেন নাকি চন্দননগরে? কথা দিচ্ছি ভালো লাগবেই, আমন্ত্রণ রইল আমার ভালোবাসার শহরে। 


Friday, 4 November 2016

আমরা বাঙালী – পর্ব ১


আমরা বাঙালী – পর্ব ১

ছোটবেলায় যখন বাজার করতে যেতাম তখন একটু ভয়ে ভয়ে থাকতাম, পাছে ভোলা ঢুশো মেরে সাইকেল সমেত ফেলে না দেয়। আসলে ভোলার তোলা না পেলে মেজাজ বিগড়ে থাকতো, আসেপাশে যাকেই দেখতে পেতো ঢুশোতে ইচ্ছে হতো তার। ও হ্যাঁ বলতে ভুলে গেছি ভোলা আদতে একটি নধরকান্তি হৃষ্টপুষ্ট কেলে ষাঁড়। যার বীরত্ব ছিল ঢুশো মারাতে, এবিষয়ে ভোলা মনে হয় পিএইচডি করেছিলো। তবে ভোলা ছিল পিওর বাঙালী ষাঁড় (ধর্মের ষাঁড় বললেও অত্যুক্তি হবে না), বেঁছে বেঁছে দুর্বল মনুষ্যগুলিকে টার্গেট করতো। আর কোনও টার্গেট ভূতলশায়ী হলে তার ব্যাগের কলাটা মুলোটা উদরস্ত করতে দেরি করতো না, কাজ মিটলে অন্য টার্গেট। ভোলার থিওরি ছিল খুব ক্লিয়ার হাম্বা বলে একটি ডাক - দিলে দাও, নইলে আমার ঢুশো তো আছেই। এই জন্যে বাজারের সবজিওয়ালারা মানে মানে আলু, পটল, মুলো যে যা পারতো দিয়ে দিতো। ভোলার পেট ঠাণ্ডা থাকলে মেজাজ ফুরফুরে, তখন সে বান্ধবীদের আই মিন অন্য গরুদের পিছনে খানিক কেষ্ট লীলা করে শনি মন্দির লাগোয়া চাতালে শুয়ে ভোঁসভসিয়ে ঘুমাত। নো জাগতিক চিন্তা নো টেনশন।

আজকের বাঙালী যুব সমাজ অনেকটা ভোলার মতো, সুপ্ত আঁতেল, স্বপ্নবিলাসী, ভাববাদী, হচ্ছে-হবে ও স্বভাব বিপ্লবী, সুখী, অলস ও পেটুক মানসিকতার। এঁরা অসম্ভব কালচার সচেতন, বুকুনি ঝাড়ায় এক্সপার্ট। কি করতে হবে এই বিষয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিপ্লব তুলে ফেলছে, কিন্তু বাস্তবে কাজের কাজ কিছুই করছে না, কাঁকড়ার সাথে আজও অদ্ভুত মিল, এখনও লেঙ্গিতে এগিয়ে।

বিশ্বাস করুন ট্রেনে, বাসে, অফিসে, পাড়ায় চায়ের দোকানে, সেলুনে, লাইব্রেরীতে যেখানে যাচ্ছি এই বাঙালী পিছু ছাড়ছে না। দেখে শুনে হেজে গেছি ভাই, তবে কি মুক্তির উপায় নাই? মনে পড়ে গেলো অনেকদিন আগে পড়া পুরন্দর ভাট নামক এক অজেয় কবির অজেয় উক্তি –

“উড়িতেছে ডাঁস, উড়িতেছে বোলতা, উড়িতেছে ভীমরুল,
নিতম্বদেশ আঢাকা দেখিলে ফুটাইবে তারা হুল।
মহাকাশ হতে গু-খেকো শকুন হাগিতেছে তব গায়
বাঙালি শুধুই খচ্চর নয়, তদুপরি অসহায়।“

Thursday, 3 November 2016



চারিদিকে স্বার্থের ঠোকাঠুকি, ভণ্ডামির কোনও সীমা পরিসীমা নেই। কেন জানি না কবি নজরুলের একটি কবিতা – মানুষ বারবার মনে পড়ে যাচ্ছে। যখন বকধার্মিকেরা ধর্মের রক্ষায়, রক্ষক ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ, তখন কবিতাটির পংক্তিগুলো আরো বেশি সত্যি হয়ে উঠেছে, তাই আজ পুরো কবিতাটি তুলে দিলাম –


মানুষ - কাজী নজরুল ইসলাম

গাহি সাম্যের গান–
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান ,
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি,
সব দেশে, সব কালে, ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি ।
‘পুজারী, দুয়ার খোল,
ক্ষুধার ঠাকুর দাঁড়ায়ে দুয়ারে পুজার সময় হলো !’
স্বপ্ন দেখিয়া আকুল পূজারী খুলিল ভজনালয়
দেবতার বরে আজ রাজা- টাজা হয়ে যাবে নিশ্চয় !
জীর্ণ-বস্ত্র শীর্ণ-গাত্র, ক্ষুধায় কন্ঠ ক্ষীণ
ডাকিল পান্থ, ‘দ্বার খোল বাবা, খাইনা তো সাত দিন !’
সহসা বন্ধ হল মন্দির , ভুখারী ফিরিয়া চলে
তিমির রাত্রি পথ জুড়ে তার ক্ষুধার মানিক জ্বলে !
ভুখারী ফুকারি’ কয়,
‘ঐ মন্দির পুজারীর, হায় দেবতা, তোমার নয় !’
মসজিদে কাল শিরনী আছিল, অঢেল গোস্ত রুটি
বাঁচিয়া গিয়াছে, মোল্লা সাহেব হেসে তাই কুটিকুটি !
এমন সময় এলো মুসাফির গায়ে-আজারির চিন্
বলে, ‘বাবা, আমি ভুখা ফাকা আছি আজ নিয়ে সাত দিন !’
তেরিয়াঁ হইয়া হাঁকিল মোল্লা–”ভ্যালা হলো দেখি লেঠা,
ভুখা আছ মর গে-ভাগাড়ে গিয়ে ! নামাজ পড়িস বেটা ?”
ভুখারী কহিল, ‘না বাবা !’ মোল্লা হাঁকিল- ‘তা হলে শালা
সোজা পথ দেখ !’ গোস্ত-রুটি নিয়া মসজিদে দিল তালা !
ভুখারী ফিরিয়া চলে,
চলিতে চলিতে বলে–
“আশিটা বছর কেটে গেল, আমি ডাকিনি তেমায় কভু,
আমার ক্ষুধার অন্ন তা’বলে বন্ধ করোনি প্রভু !
তব মজসিদ মন্দিরে প্রভু নাই মানুষের দাবী,
মোল্লা-পুরুত লাগায়েছে তার সকল দুয়ারে চাবী !”
কোথা চেঙ্গিস, গজনী-মামুদ, কোথায় কালাপাহাড় ;
ভেঙ্গে ফেল ঐ ভজনালয়ের যত তালা-দেওয়া- দ্বার !
খোদার ঘরে কে কপাট লাগায় কে দেয় সেখানে তালা ?
সব দ্বার এর খোলা র’বে, চালা হাতুড়ি শাবল চালা !
হায় রে ভজনালয়
তোমার মিনারে চড়িয়া ভন্ড গাহে স্বার্থের জয় !
মানুষেরে ঘৃণা করি
ও’ কারা কোরান, বেদ, বাইবেল চুম্বিছে মরি মরি
ও মুখ হইতে কেতাব-গ্রন্থ নাও জোর করে কেড়ে
যাহারা আনিল গ্রন্থ-কেতাব সেই মানুষেরে মেরে ।
পুজিছে গ্রন্থ ভন্ডের দল !–মুর্খরা সব শোনো
মানুষ এনেছে গ্রন্থ,–গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো ।
আদম দাউদ ঈসা মুসা ইব্রাহিম মোহাম্মদ
কৃষ্ণ বুদ্ধ নানক কবীর,-বিশ্বের সম্পদ,
আমাদেরি এরা পিতা পিতামহ, এই আমাদের মাঝে
তাঁদেরি রক্ত কম-বেশী করে প্রতি ধমনীতে বাজে !
আমরা তাঁদেরি সন্তান , জ্ঞাতি, তাঁদেরি মতন দেহ
কে জানে কখন মোরাও অমনি হয়ে যেতে পারি কেহ ।
হেস না বন্ধু ! আমার আমি সে কত অতল অসীম
আমিই কি জানি কে জানে কে আছে আমাতে মহামহিম।
হয়ত আমাতে আসিছে কল্কি, তোমাতে মেহেদি ঈসা,
কে জানে কাহার অন্ত ও আদি, কে পায় কাহার দিশা ?
কাহারে করিছ ঘৃণা তুমি ভাই, কাহারে মারিছ লাথি ?
হয়তো উহারই বুকে ভগবান জাগিছেন দিবারাতি !
অথবা হয়ত কিছুই নহে সে, মহান উচ্চ নহে,
আছে ক্লেদাক্ত ক্ষত-বিক্ষত পড়িয়া দুঃখ–দহে,
তবু জগতের যত পবিত্র গ্রন্থ ভজানালয়
ঐ একখানি ক্ষুদ্র দেহের সম পবিত্র নয় !
হয়ত ইহারি ঔরসে ভাই ইহারই কুটীর-বাসে
জন্মিছে কেহ-জোড়া নাই যার জগতের ইতিহাসে !
যে বাণী আজিও শোনেনি জগৎ, যে মহাশক্তিধরে
আজিও বিশ্ব দেখেনি–হয়ত আসিছে সে এরই ঘরে !
ও কে ? চন্ডাল ? চমকাও কেন ? নহে ও ঘৃণ্য জীব !
ওই হতে পারে হরিশচন্দ্র, ওই শ্মশানের শিব।
আজ চন্ডাল, কাল হতে পারে মহাযোগী-সম্রাট,
তুমি কাল তারে অর্ঘ্য দানিবে, করিবে নান্দী পাঠ ।
রাখাল বলিয়া কারে কর হেলা, ও-হেলা কাহারে বাজে !
হয়ত গোপনে ব্রজের গোপাল এসেছে রাখাল সাজে !
চাষা বলে কর ঘৃণা !
দেখো চাষা রুপে লুকায়ে জনক বলরাম এলো কি না !
যত নবী ছিল মেষের রাখাল, তারও ধরিল হাল
তারাই আনিল অমর বাণী–যা আছে র’বে চিরকাল ।
দ্বারে গালি খেয়ে ফিরে যায় নিতি ভিখারী ও ভিখারিনী,
তারি মাঝে কবে এলো ভোলা-নাথ গিরিজায়া, তা কি চিনি !
তোমার ভোগের হ্রাস হয় পাছে ভিক্ষা-মুষ্টি দিলে
দ্বার দিয়ে তাই মার দিয়ে তুমি দেবতারে খেদাইলৈ ।
সে মোর রহিল জমা –
কে জানে তোমারে লাঞ্ছিতা দেবী করিয়াছে কিনা ক্ষমা !
বন্ধু, তোমার বুক-ভরা লোভ দু’চোখ স্বার্থ ঠুলি,
নতুবা দেখিতে, তোমারে সেবিতে দেবতা হয়েছে কুলী ।
মানুষের বুকে যেটুকু দেবতা, বেদনা মথিত সুধা
তাই লুটে তুমি খাবে পশু ? তুমি তা দিয়ে মিটাবে ক্ষুধা ?
তোমার ক্ষুধার আহার তোমার মন্দোদরীই জানে
তোমার মৃত্যু-বাণ আছে তব প্রাসাদের কোনখানে !
তোমারি কামনা-রাণী
যুগে যুগে পশু ফেলেছে তোমায় মৃত্যু বিবরে টানি ।

ভাবের বাঙালি অথবা লোভী কাঙালির চুপকথা – পর্ব ১



ভাবের বাঙালি অথবা লোভী কাঙালির চুপকথা – পর্ব ১

এখন বাঙালী সুযোগ পেলেই ভাব ধরে তাও আবার দিন ও রাতের, ঋতুর পরিবর্তনে এমন কি বোধ হয় জোয়ার ভাটার সাথে পরিবর্তিত/ বিবর্তিত হয়। যদি এর কারন অনুসন্ধান করা যায় তাহলে দেখা যাবে স্বার্থ লাভের আশা কিংবা স্বার্থহানীর শঙ্কায় প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে/ বিবর্তিত হচ্ছে বাঙালী। ভালো ভালো ডারউইন সাহেব তো বলেই গিয়েছেন সময়ের সাথে বিবর্তিত না হলে মুছে যেতে হয় (যেমন ডাইনোসোরাসের ক্ষেত্রে হয়েছে) তাই রূপান্তর স্বাগত। বাঙ্গালীর আর একটি গুণ চোখে পরার মতো, বাঙালী নিজে অপরের দোষ ত্রুটি খুঁজে বের করতে পারঙ্গদ, কিন্তু তাঁর মধ্যে লুকিয়ে থাকা স্বার্থের খোঁজ যাতে কেউ না পায়, সেই বিষয়ে যাতে কেউ মুখ খুলতে না পারে সেজন্যে তাঁর চেষ্টা তদ্বিরের কোনও ঘাটতি থাকে না।

"ধান ভানতে শীবের গীত" টাইপ গল্প হয়ে যাচ্ছে! যে কারনে এই গল্পের অবতারনা তা হলো, যেকোন ভন্ডামির মতো ভন্ড সেকুলারিজম বা মানবতাবাদও বিপদজনক। সম্প্রতি নিউজ পেপারের পাতা উল্টালে হোক বা সোশ্যাল মিডিয়াতে চোখ বোলালেই হোক দেখা যায় – রাষ্ট্রের দমন/ পীড়নের প্রতি একশ্রেণীর শিক্ষিত, উদারমনস্ক মানুষ গর্জে উঠেছেন বীরদর্পে, কোথাও তথাকথিত সেকুলারিজমের পক্ষে গলা ফাটাচ্ছেন কেউ। আমি আগেও বলেছি আমি কখনই রাষ্ট্রকে একশো শতাংশ ক্লিনচিত দিতে পারি না, যখন রাষ্ট্রের মেকানিজমে আমার আপনার মতো আম আদমি বর্তমান তখন ভুল ত্রুটি হতেই পারে। কিন্তু কোথাও কোনও সংঘর্ষে সন্ত্রাসবাদীরা মারা গেলে গেলো গেলো রব না তুললেই কি নয়? সব সংঘর্ষই কি ভুয়ো? নাকি বুদ্ধিজীবী, মানবতাবাদী সাজার চেষ্টায় হিতাহিত জ্ঞ্যানশূন্য হয়ে পরেছি আমরা? আচ্ছা একটু দেখা যাক এই ধরনের সংঘর্ষে কারা মারা যাচ্ছে? কোনও প্রান্তিক চাষি, উপজাতির লোক, শ্রমিক, খেটে খাওয়া আম আদমি? নাকি কোনও দাগী অপরাধী, যাদের অতীতে অপরাধের প্রমান/ যোগ আছে, জেল ভেঙ্গে, কর্তব্যরত নিরীহ রক্ষীকে হত্যা করে আরও বড় কোনও অপরাধ কে সংগঠিত করার উদ্দেশে পালিয়ে যাওয়া অপরাধী তাঁরা? যত মানবতাবাদ, নীতিকথা তাঁদের জন্যে যারা অতীতে অপরাধমূলক কাজে জড়িত, সাধারণ আ্ম আদমি্র হত্যার চক্রান্ত করে, সেই চক্রান্তের বাস্তব রুপ দেয় তাঁদের জন্যে? ইদানীং বুদ্ধিজীবী, মানবতাবাদীদের রোল মডেল কারা? বিক্ষোভের নামে কাশ্মীরে নিরাপত্তাবাহিনীর উদ্দেশে পাথর, গ্রেনেড, ধারাল অস্ত্র নিয়ে হামলাকারীরা? আর যেসব নিরাপত্তা বাহিনীর জওয়ানরা মারা যাচ্ছেন কয় তাঁদের জন্যে তো বুদ্ধিজীবী, মানবতাবাদীদের কুম্ভীরাশ্রু বইতে দেখি না? বুরওয়ান ওয়ানি, ইয়াকুব মেনন, আফজল গুরু মারা গেলে এঁদের রাত্রে ঘুম চলে যায়? অথচও গঙ্গাধর দলুই, বিশ্বজিৎ ঘোরুই, তুকারাম আম্বলেদের কথা কতবার স্বরন করেছেন এনারা? অথচও কে এই বুরওয়ান ওয়ানি, ইয়াকুব মেনন, আফজল গুরু প্রমুখ সন্ত্রাসবাদীরা? কোনও মহাপুরুষ না দেশপ্রেমিক? তাহলে এই মেকি কান্না কেন?ফেসবুকে এই ধরনের পোস্টে বেশি লাইক পাওয়া যাবে, না নিজেকে উদারমনস্ক, সংখ্যালঘুপ্রেমী হিসেবে তুলে ধরা যাবে?

যারা দেশের বিচার বাবস্থার ভিত টলে যাওয়ার আশঙ্কায় সোশ্যাল মিডিয়া তোলপাড় করে দিচ্ছেন, তাঁদের কাছে খুব জানতে ইচ্ছে করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার জোশ কি তাঁদের সব সময় এরকমই থাকে? প্রতিনিয়ত আমাদের চারিপাশে কতশত অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে, মানবাধিকার কেন মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো লঙ্ঘিত হচ্ছে, তারবেলায় এঁরা চুপ কেন? পাছে নিজের নিরাপত্তা, পরিবারের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়? নাকি দেশ, রাষ্ট্র বাবস্থা হচ্ছে সফট টার্গেট, এর বিরুদ্ধে মুখ খুললে নিজের ক্ষতি হবে না সেই জন্যে? যারা সাম্যবাদ ধার করে আনেন প্রতিবেশী চীন থেকে, ভোগবাদ আমদানি করেন পশ্চিমের উন্নত রাষ্ট্রগুলি থেকে, তাঁরাই অবহেলায় বলতে পারেন ভারত রাষ্ট্রে তাঁরা নিরাপদ নন, এখানে পদে পদে মানবাধিকার, সংখ্যালঘুশ্রেণীর উপর নির্মম অত্যাচার হয়ে চলেছে। সত্যিই তো কেএফসির বার্গার, ম্যাগনামের আইসক্রিম চুষতে চুষতে আরও উন্নত ভারতের স্বপ্ন দেখা কত সহজ? হয়তো ভারত রাষ্ট্রে বসবাস করি বলি এই স্পর্ধা, নইলে তথাকথিত উন্নত, গণতান্ত্রিক দেশে রাষ্ট্রের সমালোচনা করলে কি হতে পারে সেটা বহুল প্রচলিত নিউজপেপারে চোখ রাখলেই টের পাওয়া যায়। আমরা দেশের দোষ ত্রুটি ধরার আগে নিজে দেশকে কি দিতে পেরেছি সেই হিসেব করেছি কোনদিন?

আমি কখনই অস্বীকার করতে পারি না রাষ্ট্রের ভুল হয় না, এমন অনেক ঘটনা থাকে যাতে ব্যক্তিবিশেষের স্বার্থের শিকার হয় সাধারণ মানুষ। সেই ধরনের ঘটনা অনভিপ্রেত, মেনে নেওয়া যায় না, প্রতিবাদ, বিক্ষোভ অবশ্যই কাম্য। রাষ্ট্র ন্যাংটা হলে তাঁকে কাপড় পরানোর দায়িত্ব আমাদের কেই নিতে হবে কারন আমরা এই রাষ্ট্রেরই বাসিন্দা। কিন্তু মানবতাবাদের ধ্বজাধারীরা একবার তো ভেবে দেখবেন মানবতাবাদ তাঁদের জন্যেই যারা মানুষ, যারা মানুষের ভেকধারী হিংস্র পশু, যারা দেশের সংহতির পক্ষে বিপদজনক, আম আদমির রক্তের পিপাসু তাঁদের হত্যা করাই মানবধর্ম, যুগধর্ম। দেশে অতীতে ঘটে যাওয়া সন্ত্রাসবাদী হামলাগুলি সাক্ষী, তথাকথিত সন্ত্রাসবাদী, জেহাদিরা জাত ধর্ম জিজ্ঞেস করে হত্যা করেনি।       

খুব জানতে ইচ্ছে করে এইসব মানবতাবাদীদের কোনও নিকট আত্মীয়, ভালোবাসার কেউ যদি তথাকথিত সন্ত্রাসবাদীদের হাতে নির্মমভাবে মারা যেত কিংবা ধর্ষিত হতো, তখনও কি এত বড় বড় বুলি আওড়াতে পারতেন তাঁরা? খুব সম্ভবত নয়। আগুনের থেকে দূরে বসে আগুনের উত্তাপ অনুভব না করে আগুন কিভাবে নেবানো যায় সেই বিষয়ে তত্ত জ্ঞ্যান দেওয়াটা সহজ, ময়দানে নেবে আগুন নেভাতে সাহায্য করাটা অন্য ব্যাপার। 

আমি এমন বুদ্ধিজীবী, মানবদরদী শিক্ষিত ব্যক্তিদের জানি, যাদের খুব সাদামাটা প্রশ্ন করা হয়েছিলো – আপনারা তো বলেন ভারতে সাম্প্রদায়িকটার বিষ ছড়িয়ে পড়েছে, অথচও প্রতিবেশী দেশে হিন্দু জনসংখ্যার হার দিনে দিনে কমে যাচ্ছে, ভারতে নিজ ধর্মের লোক বিপন্ন এই জিগির তুলে অন্য সম্প্রদায়ের লোকের উপর হামলা হচ্ছে কই এই বিষয়ে তো আপনাদের কোনও বক্ত্যব্য শোনা যায় না? এতে ক্ষুব্ধ হয়ে একজন বলেছিলেন এইসব সাম্প্রদায়িক কথাবার্তা বলবেন না আমি এই বিষয়ে কোনও কথা বলব না।

আমার কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু মুসলমান, তাঁর মধ্যে একজন বাল্যবন্ধু, আমাদের বাড়িতে যতবার সে এসেছে একসাথে, এক প্লেটে খাবার খেয়েছি আমরা, ওদের বাড়িতে নিঃসঙ্কোচে ইদে খেতে গেছি, (আমাদের বাড়িতে নানান পুজো,অনুষ্ঠানে তারাও এসেছে) কাকিমা এক সাথে কোর্মা, ফিরনী, লাচ্চা খেতে দিয়েছে কই আমাদের মনে আজও তো কোনও ভেদাভেদ সৃষ্টি হয়নি। আমি ও আমাদের মুসলমান বন্ধুরা খোলা মনে কখনও জঙ্গি ইস্যুতে পাকিস্থানের মুণ্ডপাত করেছি, আবার সেই দেশের গজলের, রান্নার সুখ্যাতিও করেছি, দেশ-ধর্ম বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় নি। আসলে আমরা সাদা কে সাদা, কালো কে কালো বলেছি নিঃসঙ্কোচে, আমাদের সেকুলারবাদি, মানবতাবাদী হওয়ার প্রয়োজন পড়ে নি। আজমল কাসাভ, আফজল গুরু, সালাউদ্দিন, মাসুদ আজাহার এরা সন্ত্রাসবাদী আগে, এদের ধর্ম পরে। আমি মনে করি না, কোনও ধর্ম অপর ধর্মের লোককে আঘাত করতে শেখায়, কোরান, গীতা নিয়ে যেসব লোকেরা বিবাদে জড়ায় তাঁরা কয়জন কোরান, গীতা পড়ে দেখেছে সন্দেহ আছে। 

অথচও বাঙালি বুদ্ধিজীবী, মানবদরদীরা ভোগের সময় যতটা না উল্লাস প্রকাশ করে, তার চেয়েও বেশি মাত্রায় করে ত্যাগের ক্ষেত্রে। তাদের আনন্দ প্রকাশের উল্লাসের তুলনায় শোক প্রকাশের কোলাহল অনেক তীব্র। তারা স্মরণে রাখার চেয়ে ভুলে যাওয়ার মধ্যে নিজেদের সার্থকতা প্রমাণের চেষ্টা করে। খোটা দেওয়ার অভ্যাস এবং ক্ষতস্থানে নুন ছিটিয়ে আনন্দ করাটাই তাঁদের অভ্যাস। তাই বোধ হয় প্যালেস্তাইনের মুসলমান উদ্বাস্তু বা লিবিয়ার যুদ্ধে জমিহারা মুসলিমদের জন্য, কাশ্মীরী মুসলমানদের উপর অত্যাচার করছে ভারতীয় সেনা এই ইস্যুতে রাস্তায় চোখের জল ফেলতে ফেলতে মোমবাতি মিছিল করে, স্লোগান দেয় কিন্তু প্রতিবেশী দেশে হিন্দু জনসংখ্যার হার কেন কমে আসছে, কাশ্মীরি পণ্ডিতদের পুনর্বাসনের দাবিতে, অন্যান্য ইস্যুতে সোচ্চার হতে পারে না। ধর্মের নামে ভনিতা বাঙালী বুদ্ধিজীবী, মানবদরদীদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে, তাই তাঁরা সোশ্যাল মিডিয়াতে সেকুলারবাদি হয়ে উঠতে গিয়ে আদতে দেশের, সমগ্র দেশবাসীর ক্ষতি করে ফেলছেন এই উপলব্ধি কবে হবে কে জানে? অবশ্যই রাষ্ট্র স্বৈরাচারী হয়ে উঠলে স্বাধীনতার জানালা বন্ধ হয়ে আসে, কিন্তু মেকি সেকুলার বা মানবতাবাদী হয়ে উঠতে গিয়ে আমরা আদতে রাষ্ট্রের, দেশবাসীর ক্ষতি করে ফেলছি নাতো? তসলিমা নাসরিনের কথায় বলতে পারি - আমার এখন লজ্জা নয় ভয় হয়।

(আমার এই লেখা কারও ভাবাবেগে আঘাত দেওয়ার জন্যে নয়, অপিতু এই লেখা আমার মনের কষ্টের, দ্বিচারিতার বিরুদ্ধে, তাই কেউ যদি আঘাত পেয়ে থাকেন আমি আন্তরিক ভাবেই দুঃখিত)

Wednesday, 2 November 2016

এক বিস্মৃত মহান দেশপ্রেমিকের কথা


এক বিস্মৃত মহান দেশপ্রেমিকের কথা

অনেককাল আগের কথা, বৃত্তাসুর বলে এক অসুর ছিল, সে ব্যাটা শিবঠাকুরের থেকে এক বর আদায় করল যে দেব, দানব, মানবের তৈরি প্রচলিত কোন অস্ত্রে তাঁর মৃত্যু হবে না। আপনভোলা শিব ঠাকুর তো বর দিয়ে খালাস, এদিকে বর পেয়ে বৃত্তাসুর আরও অত্যাচারী হয়ে উঠলো, ক্রমে সে দেবলোক অবধি অধিকার করে নিলো। তখন দেবতারা বিচারের আশায় ভগবান বিষ্ণুর কাছে গেলেন, সব শুনে ভগবান বিষ্ণু বললেন – তোমরা নৈমিষারণ্যে ঋষি দধীচির কাছে যাও, তাঁর অস্থি দিয়ে প্রস্তুত এক নতুন অস্ত্র বজ্র দ্বারাই বৃত্তাসুরের নিধন সম্ভব। দেবরাজ ইন্দ্র খুশীতে ডগমগ হয়ে ঋষি দধীচির কাছে ছুটলেন, দয়ালু ঋষি দধীচি সব শুনে তৎক্ষণাৎ যোগবলে দেহত্যাগ করলেন। এদিকে দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা সেই অস্থি দিয়ে বজ্র তৈরি করলেন, যা দিয়ে অধর্মী, অত্যাচারী বৃত্তাসুরের বধ সম্ভব হল, আর দেবরাজ ইন্দ্র তাঁর স্বর্গের সিংহাসন ফিরে পেলেন।

না ধান ভাঙ্গতে শিবের গীত গাইছি না, এটা উদাহরণ রুপে ভাবতে পারেন সবাই। আসলে আমরা এমন একটা সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি, চারিপাশে শুদুই লোভী, সংকীর্ণমনা মানুষের ভিড়। তা স্বত্তেও দেশের ভিতরে, বাইরে এমন কিছু বিরল দেশপ্রেমিকের নিদর্শন পাওয়া যায় যাদের দেখলে শ্রদ্ধায়, বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেতে হয়। মন নিজেকেই প্রশ্ন করে বসে এও কি সম্ভব? একজন ভারতবাসী হিসেবে সেইসব দেশপ্রেমিকের ঋণ পরিশোধ অসম্ভব, তেমনই একজন হলেন রবিন্দর কৌশিক। নামটা খুব অচেনা তাই না, হবেই কারন রাষ্ট্র এঁদের ভুলিয়ে দেয় নিজ প্রয়োজনেই।

রাজস্থানের এক অখ্যাত শহর শ্রীগঙ্গানগরে ১৯৫২ সালের ১১ই এপ্রিল জন্মগ্রহন করেন রবিন্দর কৌশিক, প্রথম জীবনে তিনি একজন সফল থিয়েটার অভিনেতা ছিলেন। সেই সুত্রে মাত্র ২১ বছর বয়সে অংশ নেন লখনউতে আয়োজিত এক জাতীয় নাটক কর্মশালায়, এই কর্মশালা থেকেই অন্যদিকে মোড় নেয় তাঁর জীবন। কারন এই নাট্য সম্মেলনেই তিনি চোখে পড়ে যান রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিটিক্যাল উইঙ্গের (RAW) কিছু পদস্ত্র অফিসারের, তাঁর অভিনয় কুশলতা দেখে ঠিক করা হয় তাঁকে আন্ডারকভার এজেন্ট হিসাবে পাকিস্থানে পাঠানো হবে। এর পর তাঁকে দিল্লীতে পাঠানো হয় দুবছরের জন্যে RAW এর অধীনে কঠোর এবং নানাপ্রকার গোপন প্রশিক্ষণের জন্যে। কেমন ছিল সেইসব প্রশিক্ষণ? শারীরিক, অস্ত্র প্রশিক্ষণ ছাড়াও তাঁকে শিখতে হয় উর্দু, এবং কয়েকটি আঞ্চলিক ভাষা। সৌভাগ্যক্রমে শ্রীগঙ্গানগরে বড় হয়ে ওঠার সুবাদে কৌশিক কয়েকটি ভাষা জানতেন যা পাকিস্থানের পাঞ্জাব প্রদেশের কথ্য ভাষা। এরপর তাঁকে ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে খুঁটিনাটি সব তথ্য সম্বন্ধে অবহিত করানো হয়, পড়ানো হয় কোরান। যখন তিনি আন্ডারকভার এজেন্ট হিসেবে পুরোপুরি তৈরি, ১৯৭৫ সালে কোনও এক ঝড়জলের রাতে পাকিস্থানের বর্ডার গার্ডদের চোখে ধুলো দিয়ে শত্রু দেশের মাটিতে পা রাখেন তিনি, নতুন নাম নেন নবি আহমেদ শাকির।

এর পরের অনেকটাই আমাদের অজানা, বহু কাঠখড় পুড়িয়ে সিভিলিয়ান ক্লার্ক হিসেবে যোগদান  করেন পাকিস্থান আর্মিতে, বিশ্বাস যোগ্যটা বাড়াতে বিয়েও করেন ‘আমানত’ নামে একজন মুসলিম মেয়ে কে, যার বাবা পাকিস্থান আর্মির অন্য একটি ইউনিটে দর্জি ছিল।

পরবর্তীকালে তিনি নিজ প্রতিভায় পাকিস্থান আর্মির উচ্চপদে উঠে আসেন, পাশাপাশি অত্যন্ত গোপনে এবং নিঃশব্দে চলতে থাকে একজন আন্ডারকভার এজেন্টের সব কাজ। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৩ সালের মধ্যে পাক সরকারের ও সেনাবাহিনীর বহু গোপন তথ্য ভারতে পাচার করেন তিনি। বহুবার তাঁর পাঠানো তথ্যের জন্যেই পাক সেনা ও জঙ্গিদের বিভিন্ন হামলা ও পরিকল্পনা বানচাল করতে সমর্থ হয় আমাদের দেশ। এই কাজে তাঁর কোড নেম ছিল ‘ব্ল্যাক টাইগার’। কিন্তু ১৯৮৩ সালের শেষের দিকে নেমে আসে বিপর্যয়, তাঁকে সাহায্য করার জন্যে পাকিস্থান পাড়ি দেয় আর একজন আন্ডারকভার এজেন্ট, যার কোড নেম ছিল ইনায়ত মসিহা। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে, কিছু ভুলের জন্যে তথ্য আদানপ্রদানের সময় ইনায়ত মসিহা ধরা পড়ে যায় পাকিস্থানি গোয়েন্দা বিভাগের হাতে। ইনায়ত মসিহা কে জেরা, টর্চার করে ‘ব্ল্যাক টাইগার’ এর আসল পরিচয় জানতে পারে পাকিস্থানের গোয়েন্দা বিভাগ। এরপরেই ১৯৮৩ সালের সেপ্টেম্বরে গ্রেপ্তার হন কৌশিক, এরপর শুরু হয় অকথ্য অত্যাচারের এক নির্মম কাহিনী। ১৯৮৫ সালে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেই তদানীন্তন পাক সরকার, পরবর্তীকালে পাক সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশে যা বদলে যায় যাবজ্জিবন কারাদণ্ডে। কিন্তু কোনভাবেই কোনও তথ্য ফাঁস করেননি এই দেশপ্রেমিক মানুষটি। একটিও কথা, তথ্য না বের করতে না পারার রোষে একবছর, দু বছর নয় টানা ১৬ বছর ধরে পাকিস্থানের বিভিন্ন যেমন শিয়ালকোট, লাখপত, মিলানওয়ালি প্রমুখ জায়গার কারাগারে অকথ্য, নির্মম অত্যাচার চালানো হয় তাঁর উপর। অবশেষে ১৯৯৯ সালের ২৬শে জুলাই মুলতানের নিউ সেন্ট্রাল জেলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন এই অসমসাহসী বীরযোদ্ধা। পাক সরকারী নথিতে কারন হিসাবে অ্যাজমা, যক্ষ্মা, হৃদরোগের কথা উল্লেখ আছে, যার সত্যটা আমরা কোনদিনও জানতে পারব না, শোনা যায় জেলের পিছনেই তাঁকে কবরস্থ করা হয়।

দেশের এই প্রকৃত বীরকে আমরা ভুলে গেছি, হয়তো সেটাই জাগতিক নিয়ম। নিশ্চয়ই এস্পিয়নেজ বা স্পাই জগতের অলিখিত নিয়ম অনুযায়ী রাষ্ট্র কোনদিনও এইধরনের এজেন্টদের স্বীকৃতি দেয় না, স্বাভাবিক নিয়ম কিন্তু যখন মেকি নায়কদের, সুবিধাবাদী নেতাদের নিয়ে মাতামাতির অন্ত নেই, চারিদিকে যখন সুবিধাবাদী, স্বার্থপর মানুষের এত ভিড় তখন কি আমরা একবারের জন্যে হলেও স্বরন করতে পারি না এই সব বীর দের? ২০১২ সালে ‘এক থা টাইগার’ সিনেমাটি তাঁর জীবনের অনুকরনেই বানানো। যদিও বাস্তবের কৌশিকদের কথা আমরা কতটুকুই বা জানি?

আজ দেশের পশ্চিমাংশে যখন আমাদের দেশের বীর সেনানীরা প্রাণপণ লড়াই চালাচ্ছে পাকিস্থানের বর্বর আক্রমণের বিরুদ্ধে, তখন প্রণাম জানাই এই বীর শ্রেষ্ঠ দেশপ্রেমিককে, সাথে অভিনন্দন জানাই সেই সব অগুনতি বীর সেনানী ভাইদের, গোয়েন্দা ভাইদের যারা আমাদের সুরক্ষায় প্রাণপাত করে লড়াই করে চলেছেন। জয় হিন্দ, বন্দে মাতরম, ভারত মাতা কি জয়।

Tuesday, 1 November 2016

বিপ্লব এসেছে হীরক রাজার দেশে


বিপ্লব এসেছে হীরক রাজার দেশে

‘‘এরা যত বেশি পড়ে, তত বেশি জানে, তত কম মানে!’’, কি পাঠক সত্যজিত রায়ের ‘হীরক রাজার দেশে’ সিনেমাটি মনে পড়ে গেলো তো। গপ্পের হীরক রাজা ছিলেন বড়ই দুষ্ট প্রকৃতির লোক, যেকোন মূল্যে মসনদ টিকিয়ে রাখতে সে ছিল বদ্ধ পরিকর। তিনি জানতেন জ্ঞ্যানলাভ বড় বাজে, প্রজারা তাঁর স্বরূপ জেনে গেলে মসনদটি উল্টে যাবে, তাই তাকে বলতে দেখা যায়, ‘এরা যত বেশি পড়ে, তত বেশি জানে, তত কম মানে’। এ তো গেল চলচ্চিত্রের এক স্বৈরাচারী, অগণতান্ত্রিক রাজার কথা। কিন্তু এ যুগের বাস্তবের রাজারা থুড়ি নেতারা কি হীরক রাজার চেয়ে কোন অংশে কম! না একেবারেই না, তা না হলে কাশ্মীর উপত্যকায় একের পর এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আগুন লাগানো কেন হচ্ছে? গত চারমাস ধরে কাশ্মীর উপত্যকায় স্কুল বন্ধ, ২৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পুড়ে ছাই। এ কেমন স্বাধীনতার আন্দোলন, বিক্ষোভ, প্রতিবাদ কর্মসূচি? এতদিন বিভিন্ন বিক্ষোভ, প্রতিবাদ কর্মসূচিতে মিছিলের সামনে রাখা হচ্ছিলো, শিশু ও কিশোরদের। নিরাপত্তা বাহিনীর দিকে পাথর ছুঁড়তে বাধ্য করা হচ্ছিলো তাঁদের, উদ্দেশ্য একটাই মিডিয়াকে, বহিঃবিশ্বকে দেখানো যে এই সংঘর্ষের শিকার শিশু এবং কিশোররাও, ভারতীয় বাহিনীর কি অমানবিক আর দমনমূলক আচরণ? কি সুন্দর চক্রান্ত্র? একদিকে মগজ ধোলাই করে শিশু ও কিশোরদের বিক্ষোভ, প্রতিবাদ কর্মসূচিতে ঠেলে দাও, অন্যদিকে একের পর এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আগুন লাগিয়ে শিক্ষার পথই বন্ধ করে দাও। না সাধু উদ্যোগ মানতেই হবে, একটা প্রজন্ম কে শিক্ষাঙ্গনের বাইরে রেখে দিয়ে তাঁদের শিক্ষিত না হতে দিলে ভবিষ্যতে তাঁদের জন্যে কর্ম সংস্থানের বাবস্থা করা কঠিন, কিন্তু হাতে বন্দুক তুলে দেওয়া যাবে অনায়সেই। স্বাধীনতার লড়াইয়ে সিপাহীর যে বড় প্রয়োজন।  

তবে এখন কি প্রতিকার? না, হীরকরাজের শিক্ষামন্ত্রী তো বলেইছিলেন, ‘‘হিতাহিতের বিচার করেন কে? করেন হীরকরাজ’, কাশ্মীরের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতারা এই ষড়যন্ত্র বুজতে পারছেন কি?