Wednesday, 2 November 2016

এক বিস্মৃত মহান দেশপ্রেমিকের কথা


এক বিস্মৃত মহান দেশপ্রেমিকের কথা

অনেককাল আগের কথা, বৃত্তাসুর বলে এক অসুর ছিল, সে ব্যাটা শিবঠাকুরের থেকে এক বর আদায় করল যে দেব, দানব, মানবের তৈরি প্রচলিত কোন অস্ত্রে তাঁর মৃত্যু হবে না। আপনভোলা শিব ঠাকুর তো বর দিয়ে খালাস, এদিকে বর পেয়ে বৃত্তাসুর আরও অত্যাচারী হয়ে উঠলো, ক্রমে সে দেবলোক অবধি অধিকার করে নিলো। তখন দেবতারা বিচারের আশায় ভগবান বিষ্ণুর কাছে গেলেন, সব শুনে ভগবান বিষ্ণু বললেন – তোমরা নৈমিষারণ্যে ঋষি দধীচির কাছে যাও, তাঁর অস্থি দিয়ে প্রস্তুত এক নতুন অস্ত্র বজ্র দ্বারাই বৃত্তাসুরের নিধন সম্ভব। দেবরাজ ইন্দ্র খুশীতে ডগমগ হয়ে ঋষি দধীচির কাছে ছুটলেন, দয়ালু ঋষি দধীচি সব শুনে তৎক্ষণাৎ যোগবলে দেহত্যাগ করলেন। এদিকে দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা সেই অস্থি দিয়ে বজ্র তৈরি করলেন, যা দিয়ে অধর্মী, অত্যাচারী বৃত্তাসুরের বধ সম্ভব হল, আর দেবরাজ ইন্দ্র তাঁর স্বর্গের সিংহাসন ফিরে পেলেন।

না ধান ভাঙ্গতে শিবের গীত গাইছি না, এটা উদাহরণ রুপে ভাবতে পারেন সবাই। আসলে আমরা এমন একটা সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি, চারিপাশে শুদুই লোভী, সংকীর্ণমনা মানুষের ভিড়। তা স্বত্তেও দেশের ভিতরে, বাইরে এমন কিছু বিরল দেশপ্রেমিকের নিদর্শন পাওয়া যায় যাদের দেখলে শ্রদ্ধায়, বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেতে হয়। মন নিজেকেই প্রশ্ন করে বসে এও কি সম্ভব? একজন ভারতবাসী হিসেবে সেইসব দেশপ্রেমিকের ঋণ পরিশোধ অসম্ভব, তেমনই একজন হলেন রবিন্দর কৌশিক। নামটা খুব অচেনা তাই না, হবেই কারন রাষ্ট্র এঁদের ভুলিয়ে দেয় নিজ প্রয়োজনেই।

রাজস্থানের এক অখ্যাত শহর শ্রীগঙ্গানগরে ১৯৫২ সালের ১১ই এপ্রিল জন্মগ্রহন করেন রবিন্দর কৌশিক, প্রথম জীবনে তিনি একজন সফল থিয়েটার অভিনেতা ছিলেন। সেই সুত্রে মাত্র ২১ বছর বয়সে অংশ নেন লখনউতে আয়োজিত এক জাতীয় নাটক কর্মশালায়, এই কর্মশালা থেকেই অন্যদিকে মোড় নেয় তাঁর জীবন। কারন এই নাট্য সম্মেলনেই তিনি চোখে পড়ে যান রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিটিক্যাল উইঙ্গের (RAW) কিছু পদস্ত্র অফিসারের, তাঁর অভিনয় কুশলতা দেখে ঠিক করা হয় তাঁকে আন্ডারকভার এজেন্ট হিসাবে পাকিস্থানে পাঠানো হবে। এর পর তাঁকে দিল্লীতে পাঠানো হয় দুবছরের জন্যে RAW এর অধীনে কঠোর এবং নানাপ্রকার গোপন প্রশিক্ষণের জন্যে। কেমন ছিল সেইসব প্রশিক্ষণ? শারীরিক, অস্ত্র প্রশিক্ষণ ছাড়াও তাঁকে শিখতে হয় উর্দু, এবং কয়েকটি আঞ্চলিক ভাষা। সৌভাগ্যক্রমে শ্রীগঙ্গানগরে বড় হয়ে ওঠার সুবাদে কৌশিক কয়েকটি ভাষা জানতেন যা পাকিস্থানের পাঞ্জাব প্রদেশের কথ্য ভাষা। এরপর তাঁকে ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে খুঁটিনাটি সব তথ্য সম্বন্ধে অবহিত করানো হয়, পড়ানো হয় কোরান। যখন তিনি আন্ডারকভার এজেন্ট হিসেবে পুরোপুরি তৈরি, ১৯৭৫ সালে কোনও এক ঝড়জলের রাতে পাকিস্থানের বর্ডার গার্ডদের চোখে ধুলো দিয়ে শত্রু দেশের মাটিতে পা রাখেন তিনি, নতুন নাম নেন নবি আহমেদ শাকির।

এর পরের অনেকটাই আমাদের অজানা, বহু কাঠখড় পুড়িয়ে সিভিলিয়ান ক্লার্ক হিসেবে যোগদান  করেন পাকিস্থান আর্মিতে, বিশ্বাস যোগ্যটা বাড়াতে বিয়েও করেন ‘আমানত’ নামে একজন মুসলিম মেয়ে কে, যার বাবা পাকিস্থান আর্মির অন্য একটি ইউনিটে দর্জি ছিল।

পরবর্তীকালে তিনি নিজ প্রতিভায় পাকিস্থান আর্মির উচ্চপদে উঠে আসেন, পাশাপাশি অত্যন্ত গোপনে এবং নিঃশব্দে চলতে থাকে একজন আন্ডারকভার এজেন্টের সব কাজ। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৩ সালের মধ্যে পাক সরকারের ও সেনাবাহিনীর বহু গোপন তথ্য ভারতে পাচার করেন তিনি। বহুবার তাঁর পাঠানো তথ্যের জন্যেই পাক সেনা ও জঙ্গিদের বিভিন্ন হামলা ও পরিকল্পনা বানচাল করতে সমর্থ হয় আমাদের দেশ। এই কাজে তাঁর কোড নেম ছিল ‘ব্ল্যাক টাইগার’। কিন্তু ১৯৮৩ সালের শেষের দিকে নেমে আসে বিপর্যয়, তাঁকে সাহায্য করার জন্যে পাকিস্থান পাড়ি দেয় আর একজন আন্ডারকভার এজেন্ট, যার কোড নেম ছিল ইনায়ত মসিহা। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে, কিছু ভুলের জন্যে তথ্য আদানপ্রদানের সময় ইনায়ত মসিহা ধরা পড়ে যায় পাকিস্থানি গোয়েন্দা বিভাগের হাতে। ইনায়ত মসিহা কে জেরা, টর্চার করে ‘ব্ল্যাক টাইগার’ এর আসল পরিচয় জানতে পারে পাকিস্থানের গোয়েন্দা বিভাগ। এরপরেই ১৯৮৩ সালের সেপ্টেম্বরে গ্রেপ্তার হন কৌশিক, এরপর শুরু হয় অকথ্য অত্যাচারের এক নির্মম কাহিনী। ১৯৮৫ সালে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেই তদানীন্তন পাক সরকার, পরবর্তীকালে পাক সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশে যা বদলে যায় যাবজ্জিবন কারাদণ্ডে। কিন্তু কোনভাবেই কোনও তথ্য ফাঁস করেননি এই দেশপ্রেমিক মানুষটি। একটিও কথা, তথ্য না বের করতে না পারার রোষে একবছর, দু বছর নয় টানা ১৬ বছর ধরে পাকিস্থানের বিভিন্ন যেমন শিয়ালকোট, লাখপত, মিলানওয়ালি প্রমুখ জায়গার কারাগারে অকথ্য, নির্মম অত্যাচার চালানো হয় তাঁর উপর। অবশেষে ১৯৯৯ সালের ২৬শে জুলাই মুলতানের নিউ সেন্ট্রাল জেলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন এই অসমসাহসী বীরযোদ্ধা। পাক সরকারী নথিতে কারন হিসাবে অ্যাজমা, যক্ষ্মা, হৃদরোগের কথা উল্লেখ আছে, যার সত্যটা আমরা কোনদিনও জানতে পারব না, শোনা যায় জেলের পিছনেই তাঁকে কবরস্থ করা হয়।

দেশের এই প্রকৃত বীরকে আমরা ভুলে গেছি, হয়তো সেটাই জাগতিক নিয়ম। নিশ্চয়ই এস্পিয়নেজ বা স্পাই জগতের অলিখিত নিয়ম অনুযায়ী রাষ্ট্র কোনদিনও এইধরনের এজেন্টদের স্বীকৃতি দেয় না, স্বাভাবিক নিয়ম কিন্তু যখন মেকি নায়কদের, সুবিধাবাদী নেতাদের নিয়ে মাতামাতির অন্ত নেই, চারিদিকে যখন সুবিধাবাদী, স্বার্থপর মানুষের এত ভিড় তখন কি আমরা একবারের জন্যে হলেও স্বরন করতে পারি না এই সব বীর দের? ২০১২ সালে ‘এক থা টাইগার’ সিনেমাটি তাঁর জীবনের অনুকরনেই বানানো। যদিও বাস্তবের কৌশিকদের কথা আমরা কতটুকুই বা জানি?

আজ দেশের পশ্চিমাংশে যখন আমাদের দেশের বীর সেনানীরা প্রাণপণ লড়াই চালাচ্ছে পাকিস্থানের বর্বর আক্রমণের বিরুদ্ধে, তখন প্রণাম জানাই এই বীর শ্রেষ্ঠ দেশপ্রেমিককে, সাথে অভিনন্দন জানাই সেই সব অগুনতি বীর সেনানী ভাইদের, গোয়েন্দা ভাইদের যারা আমাদের সুরক্ষায় প্রাণপাত করে লড়াই করে চলেছেন। জয় হিন্দ, বন্দে মাতরম, ভারত মাতা কি জয়।

Tuesday, 1 November 2016

বিপ্লব এসেছে হীরক রাজার দেশে


বিপ্লব এসেছে হীরক রাজার দেশে

‘‘এরা যত বেশি পড়ে, তত বেশি জানে, তত কম মানে!’’, কি পাঠক সত্যজিত রায়ের ‘হীরক রাজার দেশে’ সিনেমাটি মনে পড়ে গেলো তো। গপ্পের হীরক রাজা ছিলেন বড়ই দুষ্ট প্রকৃতির লোক, যেকোন মূল্যে মসনদ টিকিয়ে রাখতে সে ছিল বদ্ধ পরিকর। তিনি জানতেন জ্ঞ্যানলাভ বড় বাজে, প্রজারা তাঁর স্বরূপ জেনে গেলে মসনদটি উল্টে যাবে, তাই তাকে বলতে দেখা যায়, ‘এরা যত বেশি পড়ে, তত বেশি জানে, তত কম মানে’। এ তো গেল চলচ্চিত্রের এক স্বৈরাচারী, অগণতান্ত্রিক রাজার কথা। কিন্তু এ যুগের বাস্তবের রাজারা থুড়ি নেতারা কি হীরক রাজার চেয়ে কোন অংশে কম! না একেবারেই না, তা না হলে কাশ্মীর উপত্যকায় একের পর এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আগুন লাগানো কেন হচ্ছে? গত চারমাস ধরে কাশ্মীর উপত্যকায় স্কুল বন্ধ, ২৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পুড়ে ছাই। এ কেমন স্বাধীনতার আন্দোলন, বিক্ষোভ, প্রতিবাদ কর্মসূচি? এতদিন বিভিন্ন বিক্ষোভ, প্রতিবাদ কর্মসূচিতে মিছিলের সামনে রাখা হচ্ছিলো, শিশু ও কিশোরদের। নিরাপত্তা বাহিনীর দিকে পাথর ছুঁড়তে বাধ্য করা হচ্ছিলো তাঁদের, উদ্দেশ্য একটাই মিডিয়াকে, বহিঃবিশ্বকে দেখানো যে এই সংঘর্ষের শিকার শিশু এবং কিশোররাও, ভারতীয় বাহিনীর কি অমানবিক আর দমনমূলক আচরণ? কি সুন্দর চক্রান্ত্র? একদিকে মগজ ধোলাই করে শিশু ও কিশোরদের বিক্ষোভ, প্রতিবাদ কর্মসূচিতে ঠেলে দাও, অন্যদিকে একের পর এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আগুন লাগিয়ে শিক্ষার পথই বন্ধ করে দাও। না সাধু উদ্যোগ মানতেই হবে, একটা প্রজন্ম কে শিক্ষাঙ্গনের বাইরে রেখে দিয়ে তাঁদের শিক্ষিত না হতে দিলে ভবিষ্যতে তাঁদের জন্যে কর্ম সংস্থানের বাবস্থা করা কঠিন, কিন্তু হাতে বন্দুক তুলে দেওয়া যাবে অনায়সেই। স্বাধীনতার লড়াইয়ে সিপাহীর যে বড় প্রয়োজন।  

তবে এখন কি প্রতিকার? না, হীরকরাজের শিক্ষামন্ত্রী তো বলেইছিলেন, ‘‘হিতাহিতের বিচার করেন কে? করেন হীরকরাজ’, কাশ্মীরের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতারা এই ষড়যন্ত্র বুজতে পারছেন কি?

Monday, 31 October 2016

পাকিস্থান – একটি ব্যর্থ দেশ তবে কি ক্লাইম্যাক্স আসন্ন?






পাকিস্থান – একটি ব্যর্থ দেশ তবে কি ক্লাইম্যাক্স আসন্ন?

সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর দিকে চোখ বোলালে একটি প্রশ্ন সবার মনে উঠে আসে, সীমান্তে আবার বর্বরোচিত ঘটনা, আবার এক সৈনিকের মুণ্ডছেদ, দেহ বিকৃতি তবে কি যুদ্ধ আসন্ন্য? নাপাক পাকিস্থানকে কি সঠিক এবং জুতসই জবাব দেওয়া হবে?

না আমি যুদ্ধের স্বপক্ষে বা বিপক্ষে গলাবাজি করতে কলম ধরিনি, আমি জানি ভারত ও পাকিস্থানের মধ্যে যুদ্ধ বাঁধলে সেটা পুরোদস্তুর যুদ্ধের রুপ নেবে, হয়তো কেন পাকিস্থান প্রথমেই পরমাণু হামলা করবে আর তাঁর প্রত্যুত্তরে পাল্টা ভারত, যার ফলে এই উপমহাদেশে আড়াই কোটির বেশি মানুষ প্রান হারাবেন, গুরুতর জখম বা সারাজীবনের মতো পঙ্গু হয়ে যাবেন কম করে ৬০লক্ষের বেশি মানুষ। কিন্তু একশ্রেণীর মানুষের ভ্রান্ত উচ্চাশা, মনগড়া কিছু ভাবনার সমূলে আঘাত করাটা বেশি দরকার।

হয়তো এক এক সময় পরিস্থিতিটাই এমন দাঁড়ায় যে যুদ্ধটাই অবধারিত হয়ে যায়, এটাই যুগধর্ম। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। স্বাধীনতার জন্মলগ্ন থেকে যে দেশ শুধু ভারত বিরোধিতা করে এসেছে, সমগ্র বিশ্ব জুড়ে সন্ত্রাস রপ্তানি করে চলেছে সেই দেশের ধ্বংস অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু শত্রুর ক্ষমতা, দোষত্রুটি ভালোভাবে অনুধাবন না করে যুদ্ধে জড়িয়ে পরাটা আদৌ বুদ্ধিমানের কাজ নয়। টাই যারা যুদ্ধ যুদ্ধ জিগির তুলছেন তাঁরা সবদিক চিন্তা বিবেচনা করে এই দাবি তুলছেন তো? একটু তলিয়ে দেখে নেওয়া যাক।

পাকিস্থানের নাপাক নীতি, কূট কৌশল

সম্প্রতি জইশের মুখপত্র আল-কালামের সর্বশেষ সংখ্যায় মাসুদ আজাহারের বক্ত্যব্য - ৯০-এর দশক থেকে পাক সরকার জঙ্গিদের সরাসরি সমর্থন করে ফায়দা পেয়েছে। এখন পাক সরকার আর একটু সাহস দেখালে কাশ্মীর তো বটেই, সিন্ধু জল-সমস্যাও মিটে যাবে চিরকালের জন্য। শুধু মুজাহিদিনদের জন্য দরজাটা খুলে দিক পাক সরকার। কি অকপট উক্তি? না এটা নতুন কোন কিছু নয়, আসলে এই সবই জেনারেল জিয়া উল হকের উর্বর বুদ্ধির দান। যিনি বলে গেছিলেন ভারতকে হাজার ক্ষত দিতে হবে আর সেটা ভিতর থেকেই, যাতে ভিতরের বুনিয়াদ নড়বড়ে হয়ে যায় আর আমাদের এক আঘাতেই ভেঙ্গে পড়ে। তিন তিনবার শোচনীয় পরাজয়ের পর পাকিস্থানের অঘোষিত নীতিই হল “হাজার ক্ষত আর হিট অ্যান্ড রান”। ১৯৯৯ সালে এই জেনারেল জিয়া উল হকের প্ল্যান অনুযায়ী টার্গেট বানানো হয় দেশের ভিতরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মাদ্রাসা গুলিকে, যেখানে উস্কে দেওয়া হবে ভারত বিরোধী জিগির তাও ধর্ম রক্ষার নামে আগুনে সেঁকে নিয়ে। ছড়িয়ে দিতে হবে এই বার্তা – কাশ্মীরে মুসলমান ভাইরা ভারতের হিন্দু শাসকের হাতে অত্যাচারিত এবং নিপীড়িত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আর একটি গাঁজর – আম পাবলিককে গিলিয়ে দাও জিহাদের লক্ষ্য হল মুঘল আমলের মুসলিম শাসন কে ফিরিয়ে আনা, অর্থাৎ কিনা ভারত, পাকিস্থান, বাংলাদেশ, আফগানিস্থান সব এক শাসনের ছাতার নীচে চলে আসবে।


এই স্বপ্নের পোলাওতে ঘি ঢেলে চলেছে সবকটি ভারত বিরোধী সংগঠন, আর প্রধান বাবুর্চি পাকিস্থান তো আছেই।

সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর দিকে চোখ বোলালে দেখা যাবে নবতম সংযজন রাজধানীর অলিন্দে আইএসআইএর চর, এর আগেও এধরনের ঘটনা ঘটলেও সম্প্রতি বারবার সামনে চলে আসছে আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ছিদ্রগুলি। শত্রুকে আক্রমণ করতে গিয়ে এটা ভুলে গেলে চলবে না দেশের ভিতরে আজও ঘাঁটি গেঁড়ে বসে আছে মিরজাফর, জগতশেঠের দল, কে বলতে পারে শত্রুর আক্রমণ বা প্রতি আক্রমনে তাঁরা শত্রুকে রসদ যোগাবেন না দেশের ভিতর থেকে? তাই যারা আবার একটি সারজিক্যাল স্ট্রাইক  চেয়ে গলা ফাটাচ্ছেন তাঁদের উদ্দেশে বলি আজ সীমান্তে সারজিক্যাল স্ট্রাইকের  পাশাপাশি আশু প্রয়োজন দেশের অভ্যন্তরে সারজিক্যাল স্ট্রাইকের যাতে শত্রু শিবিরে তথ্য বা অন্য কোনও রকম সাহায্য না পৌছাতে পারে সেবিষয়ে সুনিচ্ছিত হওয়া দরকার।

পাকিস্থানের বিরুদ্ধে কি আদৌ পাশে পাওয়া যাবে কোনও দেশ কে?

উরি হামলার পর আমেরিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, বাংলাদেশ, ব্রিটেন, রাশিয়ার খানিকটা সমর্থন পেয়েছি আমরা, কিন্তু পাকিস্থানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে কোনও দেশই এগিয়ে আসবে না। সবাই গা বাঁচাতে ব্যাস্ত যাতে তথাকথিত জিহাদের আঁচ নিজেদের দেশে যাতে না পড়ে। আজ যে আমেরিকা ভারতের কাছাকাছি এসেছে (হয়তো খানিকটা নিজেদের তাগিদেই, পরবর্তীকালে এই নিয়ে লেখা যাবে) ভুলে গেলে চলবে না এই আমেরিকাই সপ্তম নৌবহর পাঠিয়েছিল, তদানীন্তন দোসর পাকিস্থান কে বাঁচানোর জন্যে। সেই সময় রাশিয়া ভারতের সাহায্যে এগিয়ে না এলে হয়তো গল্পটা অন্যরকম হতো।

বৃহৎ শক্তিগুলি অস্ত্র বিক্রয়ের সহজলভ্য বাজার হিসাবে এই উপমহাদেশে কখনই চাইবে না সমস্যার সমাধান হোক বরং চাইবে তোমরা যুদ্ধ করো, সমরাস্ত্র যা লাগবে আমরা দেবো, তোমরা শুদু কড়ি ফেলো। কে না জানে অস্ত্র যখন লাভজনক পন্য তখন যুদ্ধের থেকে বড় বিজ্ঞ্যাপন আর কিছু হতে পারে না।

তাহলে আমাদের এখন কি করা উচিত?

১) এবিষয়ে মহামতি চাণক্যের নীতি অনুসরণ করা উচিত আমাদের – আমাদের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা গুলিকে ঢেলে সাজাতে হবে। উস্কে দিতে হবে বালুচিস্থান, ওয়াজিরিস্থান, সিন্ধু প্রদেশ সমস্যাগুলি, যাতে ভিতরে ভিতরে গৃহযুদ্ধে ক্ষয়ে যায় পাকিস্থান। তবে ঢাকঢোল পিটিয়ে ৫৬ইঞ্চি ছাতি না পিটিয়ে (আমাদের সহজাত অভ্যাস হল যে কোনও সফলটাকে ভোট বাক্সের রাজনীতি বানানো, এর থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন) অতি সঙ্গোপনে।

২) আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সেনা ও অর্থনৈতিক পরিকাঠামোর আমুল পরিবর্তন দরকার। দেশে নতুন নতুন শিল্প, ব্যাবসার দিক খুলে দিয়ে অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্র হয়ে উঠতে হবে ভারতকে। অস্ত্র আমদানির চেয়ে দেশেই বানাতে হবে উন্নত অস্ত্র, এতে কর্মসংস্থানও হবে, দেশের পরিকাঠামো শক্তিশালী হয়ে উঠবে।

৩) আমেরিকা, ইসরায়েল, রাশিয়ার সাথে সামরিক সুসম্পর্ক আরও উন্নত করতে হবে, পাশাপাশি পাকিস্থানের পাশাপাশি সম্ভাব্য শত্রু কে চিনে নিতে হবে। হ্যাঁ আমি চীনের কথা বলছি, চীনই একমাত্র দেশ যে পাকিস্থানকে দরাজ হাতে সমর্থন করে। অবশ্যই নিজের স্বার্থে, চীন এশিয়া সহ সারা বিশ্বে দাদাগিরি করতে চায়, এমতাবস্থায় শত্রুর শত্রু আমার মিত্র প্রবাদটিকে যথাযথ রুপে কাজে লাগাতে হবে। চীনের প্রতিপক্ষ্য দেশগুলিকে নিয়ে একটি জোট তৈরি করতে হবে, যাতে পারস্পরিক নির্ভরতা বৃদ্ধি পায়। ভুলে গেলে চলবে না ভারতে বিশাল বাজারের উপর চীনের নজর আছে, সেই বাজারকে কাজে লাগিয়ে চীনকে পাকিস্থানের পাশ থেকে সরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে। চীন ও পাকিস্থান দুটি দেশের বিরুদ্ধেই সব সময় তৈরি থাকতে হবে সামরিক এবং অর্থনৈতিক উভয়দিকেই।

৪) রক্ষণাত্মক নীতি থেকে সরে এসে রক্ষণাত্মক আক্রমণের নীতি নিতে হবে আমাদের। পাকিস্থানের অর্থনীতি এমনি বিধ্বস্ত, দৈনন্দিন পরিকাঠামোগত খরচ সামলাতে হিমসিম খাচ্ছে শরিফ সরকার। জঙ্গি পোষার খরচ, তাঁদের অস্ত্র শস্ত্র সমেত যাবতীয় খরচার একটা বড় অংশ আসে বিদেশ থেকে অনুদান বাবদ। পাকিস্থান এই অনুদান পেয়ে থাকে দেশের আভ্যন্তরীণ উন্নয়ন আর সামরিক বাহিনীর আধুনিকীকরণের জন্যে, যেটা তাঁরা ব্যয় করে থাকে জঙ্গি দের মদতের কাজে।  কিন্তু আন্তজাতিক বিশ্ব ধীরে হলেও পাকিস্থানের স্বরূপ বুজতে পারছে, তাই তারাও আজ হাত গুটিয়ে নিচ্ছে। আরও ব্যাপক হারে পাকিস্থানের মুখোশ বহিবিশ্বের কাছে খুলে দিতে হবে যাতে আরও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে পাকিস্থান। তাঁদের অর্থের যোগান বন্ধ করে দিতে হবে। সময় এসেছে মোস্ট ফেভারদ নেশনের তকমা কেড়ে নিয়ে পাকিস্থানের সাথে ব্যাবসা বানিজ্য বন্ধ করার। যাতে পাকিস্থান সমুহ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়, সাথে সাথে কূটনৈতিক দিক থেকেও বিচ্ছিন্ন করে দিতে হবে পাকিস্থানকে। নদী কূট নীতির সম্মুখীন হয়েছি আমরা, মিত্র পাকিস্থানের কথায় ইতিমধ্যে চীন ব্রহ্মপুত্রের একটি উপনদীর জল আটকাতে শুরু করে দিয়েছে, সেখানে সিন্ধু জলচুক্তি ভাঙ্গার রাস্তায় ভারত যাবে কিনা সেটা ভাবার অবকাশ থাকলেও, পাল্টা চাপ আফগানিস্থানের দিক থেকে দেওয়া যেতেই পারে। ইতিমধ্যে আফগানিস্থানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি আফগানিস্থানের পূর্বাঞ্চলে যে তিনটি প্রধান নদী আছে তাঁর উপর বাঁধ নির্মাণের জন্যে ভারতের সাহায্যের মুখাপেক্ষী। যেখানে ইতিমধ্যে আফগানিস্থানের পশ্চিমাংশে হেরাট প্রদেশে হরি নদীর উপর সালমা বাঁধ ও জলাধার তৈরি করছে ভারত তাই আফগানিস্থান চায় দেশের পূর্বাঞ্চলেও এই ধরনের বাঁধ তৈরি করে দিক ভারত। আফগানিস্থান এমনিতেই পাকিস্থানি জঙ্গি সন্ত্রাসের শিকার, তাই পারস্পরিক নির্ভরতা বাড়িয়ে দুটি দেশ একত্রে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই করলে আখেরে লাভ হবে। আফগানিস্থানে একটি শক্তিশালী বেস থাকা দরকার ভারতের এটা উপলব্ধি করতে হবে। 

৫) সর্বোপরি নিজের দেশের নিরাপত্তা ব্যাবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে, যাতে আস্তিনের সাপ ছোবল মারতে না পারে। সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ ভুলে, ভোট ব্যাঙ্কের রাজনীতি, তোষণের নীতি ছেড়ে সব ধর্মের মানুষকে একত্র করতে হবে। মনে রাখতে হবে এই দেশ শুধু মাত্র কোনও একটি জাতির, ধর্মের মানুষের জন্যে নয় এই দেশ সমগ্র ভারতবাসীর। জাতীয়তাবাদের ধুয়ো তুলে কোনও সম্প্রদায়কে একঘরে বা নিপীড়ন করে নয়, তাঁদের সমস্যা আন্তরিকভাবে অনুধাবন করতে হবে। যাতে তাঁরা কোনও দেশ বিরোধী শক্তির কাঠপুতুল না হয়ে যেতে পারে।

দেশ নানান সমস্যার সম্মুখীন, এই দ্রোহকালে যদি শুভ বুদ্ধির উদয় না হয় তাহলে আমরাই পিছিয়ে পড়ব। অতীতকাল থেকে যুদ্ধ কোনও সমস্যার সমাধান দিতে না পারলেও যুদ্ধ হয়েছে আর ভবিষ্যতেও হবে। কিন্তু যুদ্ধকে এড়িয়ে কূটনৈতিক পথে যদি পাকিস্থানকে সমুচিত জবাব দেওয়া যায় এর থেকে ভালো কি বা হতে পারে। এরপরেও যদি যুদ্ধের পথে যেতে হয় সেটা নির্ণায়ক যুদ্ধই হোক।

Wednesday, 26 October 2016

ছোটবেলায় ভুত চতুর্দশী বা নরক চতুর্দশী



ছোটবেলায় ভুত চতুর্দশী বা নরক চতুর্দশী

কালীপূজো এলে আমি যেন আমার কৈশোরে ফিরে যাই, মনে পড়ে যায় সেই সব ফেলে আসা দিনের কথা। সেই সময় হাওয়ার বদল টের পাইয়ে দিত, কালীপূজো আসছে। আমাদের বাড়িতে এই সময় আকাশ প্রদীপ দেওয়া হতো, সেই সময় তো ডিশ টিভি ছিল না, সম্বল বলতে ছিল ছাদের মাথায় অ্যান্টেনা। তার সাথেই একটুকরো বাঁশ বেঁধে তাতে একটি নীল রঙের ছোট ডুম দিয়ে আলো দেওয়া হতো। কোন এক পড়ন্ত বিকালে আমি আর বাবা ছাদে উঠে এই কাজে লেগে পড়তাম গভীর আগ্রহ নিয়ে, সন্ধ্যার আকাশে যখন সেই নীল ডুমখানি জ্বলে উঠত, অদ্ভুত এক মায়াবী পরিবেশ সৃষ্টি হতো চারিদিকে। আমি চুপ করে বসে সেই নিস্তব্দতায় হারিয়ে যেতাম।

কালীপূজোর সাথে আমার বিশেষ আগ্রহ ছিল ভুত চতুর্দশী বা নরক চতুর্দশী নিয়ে, দুপুরে মায়ের হাতের চোদ্দশাঁক ভাজা, গরম ভাতের সাথে ঘি দিয়ে অপূর্ব লাগতো। মা বাবা কে বলে দিতো – ঠিক করে দেখে আনবে, ভুলে যাবে না কিন্তু। বাবা্ ঠিক বাজার থেকে খুঁজেপেতে নিয়ে আসতো, তবে তথাকথিত চোদ্দশাঁকের মধ্যে সব ঠিক ঠিক থাকতো কিনা দেবা ন জানন্তি। শাস্ত্রমতে এই শাকগুলি হল যথাক্রমে— ওল, কেঁউ, বেতো, সর্ষে, কালকাসুন্দে, নিম, জয়ন্তী, শাঞ্চে, হিলঞ্চ, পলতা, শৌলফ, গুলঞ্চ, ভাঁটপাতা এবং শুষণী। আজকের প্রজন্ম হয়তো জানেই না এই চোদ্দশাঁকের কথা। তাঁরা হয়তো হেঁসে উড়িয়ে দেবে এসব গ্রাম্য প্রথা বলে। কিন্তু এর পিছনেও বিজ্ঞান সম্মত ব্যাখ্যা আছে – এই সময় যেহেতু ঠাণ্ডার আমেজ এসে যায়, হাওয়ায় ভাসে হিম যা থেকে নানারকমের রোগ সৃষ্টি হয়, তাই শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বাড়ানোর জন্যে এই চোদ্দশাঁক খাওয়ার প্রথা। তাই আমার মতে খাওয়াই ভালো, আর যাই হোক এতে ক্ষতি তো কিছু নেই। যাই হোক ফিরে আসি প্রসঙ্গে, নরক চতুর্দশীর দিন বাড়ীর আনাচে কানাচে ১৪টি প্রদীপ দেওয়া হতো। আমি খুঁজে খুঁজে বের করতাম অন্ধকার জায়গাগুলো, মা বলতো এই দিনে প্রেতলোক থেকে আত্মারা পৃথিবীতে নেমে আসে। যেসব আত্মারা প্রেতলোক প্রাপ্ত হয়, যারা স্বর্গ/নরক কোনটাতেই যেতে পারে না, তারা এই দিনে জেগে ওঠে। এই একদিন তাঁদের আলো দেখানো হয়, এতে তাঁরা খুশি হয়, এছাড়া আজকের দিনে এই চোদ্দ প্রদীপ দিয়ে মা লক্ষ্মীকেও গৃহে আসার আমন্ত্রণ দেওয়া হয়। আমিও বেশ খুশি হতাম আর যাই হোক আজ ভুতে আমার ঘাড় মটকাবে না, তাঁদের যে খুশি করা হচ্ছে আজ। আগে মাটির প্রদীপ দেওয়া হতো, তাতে রেড়ির তেল দেওয়া হতো, পরে অবশ্য প্রদীপের জায়গা নিয়েছিল মোমবাতি। পরে বাবার কাছে, বই পড়ে জেনে ছিলাম আরও অনেক অজানা তথ্য যে – এই নরক চতুর্দশীর দিনই কৃষ্ণ ভগবান নরকাসুরকে বোধ করে ছিলেন, থুড়ি তিনি তো নন বধ করেছিলেন তাঁর স্ত্রী সত্যভামা। দশেরায় যেমন রাবণের মূর্তি দাহ করেন উত্তর ভারতের মানুষজন, গোয়ায় তেমনি দাহ করা হয় নরকাসুরের মূর্তি। মনে করা হয়, নরাকসুরের এই প্রতীকী দহন সৌভাগ্য, সমৃদ্ধি নিয়ে আসবে, দূর করবে যাবতীয় অশুভ শক্তি, সমাজ পাপমুক্ত হবে। কে জানে আদৌ আমাদের সমাজ কোনদিন পাপমুক্ত, অশুভ শক্তির হাত থেকে পরিত্রাণ পাবে কিনা? আবার প্রসঙ্গ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছি, ফিরে আসি নিজের কথায়। বাড়ীর আনাচে কানাচে, কুয়োর ধারে, তুলসী মঞ্চের পিছনে মোমবাতির নরম আলো অদ্ভুত এক মায়াবী পরিবেশ সৃষ্টি করতো। আমি আর আমার পোষা কুকুর লুসি চুপ করে বসে সেই মায়াবী পরিবেশের আনন্দ নিতাম যতক্ষণ না মা ডাক দিতো।

আজকের কর্মব্যাস্ত জীবনে যখন সব হারানোর পালা, তখন হয়তো স্মৃতি সবথেকে বড় পাওয়া। 

আমি মনেপ্রানে বিশ্বাস করি প্রত্যেকটি সার্বজনীন উৎসব মন্দের বিরুদ্ধে ভালোর জয়কে উদযাপন করে হয়ে থাকে। দীপাবলির এই উৎসব অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলো জ্বালানোর উৎসব, নিজের অন্তরের সকল অজ্ঞতা, অন্ধকারকে মুছে ফেলে আলোয় উত্তরণের উৎসব। হয়তো অঞ্চল বিশেষে দীপাবলির মাহাত্ম্য ভিন্ন ভিন্ন, কিন্তু মূল কথা এক - আত্মাকে প্রজ্বলিত করে পরিশুদ্ধ করে সেই পরমব্রহ্মে লীন হওয়ার পথই দেখায় এই উৎসব। সবার ভালো হোক, সবাই ভালো থাকুন, ভালো রাখুন।

Thursday, 20 October 2016

ভারতীয়দের থুড়ি বাঙ্গালীর শোকের আয়ু ঠিক কত?




ভারতীয়দের থুড়ি বাঙ্গালীর শোকের আয়ু ঠিক কত?

বেশ কিছুদিন আগে কোন এক লেখায় পড়েছিলাম –

“বিংশ শতাব্দীতে
মানুষের শোকের আয়ু
বড় জোর এক বছর।”
তুমি একবিংশতে নেই
তাই পারোনি দেখে যেতে,
একবিংশ শতাব্দীতে
মানুষের শোকের আয়ু
বড় জোর এক দিন কি দুই দিন।
শিশির জমতে শুরু করার সময়ে
শোক এখন বাষ্প হয়ে উবে যায়,
সুর্য্য ডোবার সময়কাল পর্যন্ত
মানুষ আর অপেক্ষা করেনা
প্রহসনের কোরাসে মিশে যেতে।
লাশগুলো নিমেষে পঁচে যায়,
ভাগ্যবান দুই – একজন
মায়াকান্নার সাগরে ভেসে যেতে যেতে
বিক্রয়যোগ্য মমি হয়ে উঠেন!!”

এই কিছুদিন আগে পর্যন্ত উরি হামলায় নিহত জওয়ানদের জন্যে চোখের জল ধরে রাখতে পারছিল না দেশপ্রেমিক বাঙ্গালীরা, সোশ্যাল মিডিয়াকেই ব্যাটেলফিল্ড বানিয়ে পাকিস্থানের মুণ্ডু পাত চলছিলো তীব্র গতিতে, কোন পথে পাকিস্থানকে দিতে হবে উপযুক্ত জবাব, সে বিষয়ে মোদীজী কিংবা দোভাল সাহেব কে পরামর্শ দিতে পিছপা নই আমরা, আজ একি ছন্দপতন? উরি হামলা, সারজিক্যাল স্ট্রাইক এর পর সিন্ধু দিয়ে কত জল তো গড়িয়ে গেলো, আরও কতবার ক্ষতবিক্ষত হল কাশ্মীর, কিন্তু বীর বাঙ্গালীদের কোন পোস্ট তো চোখে পড়ল না? অবশ্য সংস্কৃতিমনস্ক, উদার মানুষ আমরা, অসব হামলাতামলা তো কাশ্মীরে হয়েই থাকে, এর জন্য শারদউৎসবে যাতে ঘাটতি না থাকে তার জন্যে দেদার সেলফি তুলেছি আর পোস্ট করেছি।  না আমি উৎসব, আনন্দ এসবের বিরোধিতা করছিনা, আমার আপত্তি লোক দেখানো দেশপ্রেমে, আধুনিকটায়। সত্যিই তো আমরা দোষী, এর আগেও তো কতবার রক্তাক্ত হয়েছে দেশ, কেউ না কেউ হারিয়েছে তাঁদের স্বজনকে, কিন্তু কিছুদিন বাদে আমরা আবার সব ভুলে চক্রী, মদতদাতা, খুনিদের হয়ে গলা ফাটিয়েছি, ধুয়ো তুলেছি তথাকথিত মানবতা, নৈতিক দায়িত্ব আরও কত কিছুর? কিন্তু কাজের কাজ কিছুই করি নি, বলা ভালো করার চেষ্টাই করিনি, হয়তো তার জন্যেই পড়শি দেশে আমাদের ঠিক চিনেছে, আমরা ঘেউ ঘেউ বেশি করি এর থেকে বেশি কিছু করার ক্ষমতা নেই আমাদের। 

Saturday, 15 October 2016

লক্ষ্মী পুজোর পাঁচালী


লক্ষ্মী পুজোর পাঁচালী

“শঙ্খ বাজিয়ে মাকে ঘরে এনেছি
সুগন্ধে ধূপ জ্বেলে আসন পেতেছি।
প্রদীপ জ্বেলে নিলাম তোমায় বরণ করে
আমার এ ঘরে থেকো আলো করে।
এসো মা লক্ষ্মী বসো ঘরে
আমার এ ঘরে থেকো আলো করে।“

আজ কোজাগরী লক্ষ্মী পুজো, কোজাগর – কে জাগে? যার নেই সে পাবার আশায় জাগে, যার আছে ভুরি ভুরি সেও জাগে হারাবার ভয়ে। হয়তো সারা রাত জাগবার জন্যেই এই লক্ষ্মী আগমনী গান গুলো তৈরি হয়েছিলো। যাই হোক লক্ষ্মী পুজো শুনলে আমার আগে মনে পড়ে যায় এক পূর্ববঙ্গীয় মানে বাঙাল বন্ধুর বাড়িতে পেট পুরে খিচুড়ি, লাবড়া, আলুরদমের কথা। তখন বাঙাল – ঘটি লড়াই ছিল খেলার মাঠে, মনের মাঝে নয়। তাই অকপটে, অম্লানভাবে আমরা সব বন্ধুরা মিশে যেতে পারতাম। লক্ষ্মী পুজোর দিন বিকাল থেকেই আমরা সেজে গুঁজে, সাইকেল নিয়ে দল বেঁধে ওই বন্ধুটির বাড়ী পৌঁছে যেতাম, দিদি, কাকিমা আমাদের সাদরে ডেকে নিয়ে গিয়ে বসাতেন ভিতরে। হাতে ধরিয়ে দিতেন শাল পাতার থালা, তাতে লক্ষ্মী পুজো উপলক্ষে ঘরে বানানো মুড়কি, নারকেল নাড়ু, তিলের নাড়ু, ফলমুল কত কিছু। তবে প্রধান আকর্ষণ ছিল সেই ভুনি খিচুড়ি, লাবড়া আর ঝাল ঝাল আলুরদম। উফফ এখনও যেন মুখে লেগে আছে সে স্বাদ, গন্ধ। কর্মসূত্রে, সময়ের আবর্তনে আজ সব বন্ধুরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছি নানান জায়গায়, যোগাযোগ বলতে হোয়াটসঅ্যাপ, আর মোবাইলে কথা। আর এখন কাজের সুবাদে লক্ষ্মীপুজোর ছুটি উপভোগ করা যায়না, তাই আজকের জ্যোৎস্না প্লাবিত সন্ধায় স্মৃতি একমাত্র সাথী আমার।

(ছবি প্রতীকী মাত্র, গুগল এর থেকে নেওয়া)

Friday, 14 October 2016

পিতৃপক্ষ, দেবীপক্ষের পর এবার কি অগ্নিপক্ষ?






পিতৃপক্ষ, দেবীপক্ষের পর এবার কি অগ্নিপক্ষ?

কালামজী আজ আপনার জন্মদিন, সমগ্র দেশ আজ শ্রদ্ধার সাথে আপনাকে স্মরণ করছে। কিন্তু আমার আপনার উপর খুব খুব রাগ হচ্ছে। আপনি কি বলুন তো? সারা কর্ম জীবনে মাত্র দুদিন ছুটি নিলেন? তাও একদিন মায়ের আর একদিন বাবার মৃত্যুদিনে। কি অদ্ভুত কথা বলে গেলেন বলুন তো? আমার মৃত্যুতে ছুটি ঘোষণা করো না - আমায় যদি ভালবাসো, মন দিয়ে কাজ করো সে দিন। একি সর্বনেশে কথা বলুন তো? একটু ছুটিছাঁটা না পেলে আমোদ প্রমোদের কি হবে? আপনি কেন রাজনীতিতে এলেন? আর যদিও বা এলেন নিজের আখের না গুছিয়ে সারা জীবনের সঞ্চয়, বেতনের সব টাকা নিজের প্রতিষ্ঠিত একটি ট্রাস্টে দান করে দিলেন? যখন আপনাকে এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হল আপনি কি বললেন? ‘আমি তো এখন ভারতের রাষ্ট্রপতি। যতদিন বেঁচে আছি, সরকার আমার ভরণ-পোষণ দিতে যাচ্ছে। তবে আমার সারা জীবনের সঞ্চয় ও বেতন কী করব?’ খুব ভুল বললেন আপনি যে ভারতবর্ষে রাজনীতি একটি লাভদায়ক পেশা, সেই পেশায় থেকে এতটা নির্লোভ কিভাবে হলেন আপনি? বড় অদ্ভুত কথা বলে গেলেন - ‘স্বপ্ন তা নয়, যা মানুষ ঘুমিয়ে দেখে; স্বপ্ন তা যা পূরণের আকাঙ্ক্ষা মানুষকে ঘুমাতে দেয় না’। আমৃত্যু আমাদের একি স্বপ্ন দেখতে শেখালেন আপনি? ভোগ নির্ভর আধুনিক সমাজে আপনি বড্ড বেমানান কালাম সাহেব।

ব্যক্তিগত জীবনে অকৃতদার, নির্লোভ, নিরহংকার ও সততার এক উজ্জ্বল মূর্তি স্তাপন করে গেলেন, ২০০২ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ভারতের ১১তম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেও আপনি কখনও সততার আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি, উল্টে জীবনযাপনের ক্ষেত্রেও রেখে গেলেন এক অদ্ভুত নিদর্শন -  শার্ট আর ট্রাউজার ছিল আপনার নিত্যসঙ্গী, আর বাড়িতে আপনি  পরতেন লুঙ্গি ও ফতুয়া! কি সাদামাঠা জীবনজাপন আপনার? আমাদের ভারতবর্ষ কে পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিনত করেও পরমাণু অস্ত্র মুক্ত বিশ্ব গড়ার প্রচারে যোগ দিলেন আপনি? শুধু কি তাই শোনা যায় একবার রাষ্ট্রপতি ভবনে আপনার কয়েকজন নিকট আত্মীয় কয়েকদিন কাটিয়ে যাওয়ায়, তাঁদের সব খরচ খরচা বাবদ পুরো টাকা আপনি বেতনের টাকা থেকে মিটিয়ে দিয়েছিলেন। যেখানে সপরিবারে সরকারী খরচায় বিদেশ ভ্রমন, অকাতরে ব্যয় আজকালকার রাজনৈতিক নেতাদের ফ্যাশান সেখানে একি দৃষ্টান্ত স্তাপন করলেন আপনি?

আপনার জন্মদিনে আপনার বলা কিছু কথা খুব মনে পড়ে যাচ্ছে, তাই সেগুলো উল্লেখ না করে পারলাম না। যদি পারেন অধমের ধৃষ্টতা নিজগুণে ক্ষমা করে দেবেন।

নিজেকে একা মনে হলে আকাশের দিকে তাকাও। আমরা একা নই। পৃথিবীটা আমাদের বন্ধু। যারা কাজ করে ও স্বপ্ন দেখে প্রকৃতি তাঁদের সাহায্য করে।

যদি সূর্য হতে চাও তবে সূর্যের মতো নিজেকে পোড়াও।

মানুষের জীবনে প্রতিবন্ধকতা থাকা দরকার। বাধা না থাকলে সফলতা উপভোগ করা যায় না।

তিনজনই পারেন একটি দেশ বা জাতিকে বদলাতে। তাঁরা হলেন, বাবা, মা ও শিক্ষক।

স্বপ্ন, স্বপ্ন, স্বপ্ন। স্বপ্ন দেখে যেতে হবে। স্বপ্ন না দেখলে কাজ করা যায় না।

যারা পরিশ্রম করেন সৃষ্টিকর্তা তাঁদের সাহায্য করেন।

স্বপ্নবাজরাই সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারেন।

উন্নত ও নিরাপদ ভারত রেখে যেতে পারলেই পরের প্রজন্ম আমাদের মনে রাখবে।

মন থেকে যারা কাজ করে না তাঁদের জীবন ফাঁপা। সাফল্যের স্বাদ তাঁরা পায় না।

কেবল বিশেষ সময়ে নয় সবসময় নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করে যেতে হবে।

তরুণদের নতুন চিন্তা করতে হবে, নতুন কিছু ভাবতে হবে, অসম্ভবকে সম্ভব করতে হবে। তবেই তারুণ্যের জয় হবে।

উদার ব্যক্তিরা ধর্মকে ব্যবহার করে বন্ধুত্বের হাত বাড়ান। কিন্তু সংকীর্ণমনস্করা ধর্মকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে।

সেই ভালো শিক্ষার্থী যে প্রশ্ন করে। প্রশ্ন না করলে কেউ শিখতে পারে না। শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করার সুযোগ দিতে হবে।

যদি আমরা স্বাধীন হতে না পারি কেউ আমাদের শ্রদ্ধা করবে না।

বিজ্ঞান মানুষের জন্য উপহার। ধ্বংসের জন্য বিজ্ঞান নয়।

প্রশংসা করতে হবে প্রকাশ্যে কিন্তু সমালোচনা ব্যক্তিগতভাবে।

আমি কখনো সন্দেহ করিনি যে আমাদের মসজিদের প্রার্থনা যেখানে পৌঁছায়, সেই একই গন্তব্যে পৌঁছায় মন্দিরের প্রার্থনাও।

আপনারা আপনাদের মাকে খুশি করুন। কেননা প্রতিটি ঘরের মা সুখী থাকলে সুখী হয় প্রতিটি ঘর। ঘর সুখী হলে সুখী হয় সমাজ, সমাজ হলে দেশ। এভাবেই সুখী হবে পুরো বিশ্ব।

(ক্ষমা করবেন আমি মনে করি প্রয়াত রাষ্ট্রপতি এপিজে আব্দুল কালাম আমাদের কাছে সব সময় গুরুত্বপূর্ণ কারণ আমরা ওনার কাছ থেকে কিছু শিখতে পারি, তাই আজও তিনি অনুকরণীয়। আমাদের দেশে যে সব রাজনৈতিকরা বর্তমানে আছেন কেন জানি না তাঁদের অনুসরণ করার স্পৃহা জাগে না। এটা সত্যিই কোন ভালো লক্ষণ নয় - আমাদের সামনে যদি অনুসরণের মত আলোক শিখাগুলো নিভে যায় বা হারিয়ে যায় তাহলে আমরা অন্ধকারে পথ হারাব। সেটা আমি বা আমরা কেউই চাই না। অন্ধকারের হাতে সমর্পণ নয়, আমরা আলোর মিছিলে সামিল হতে চাই। যদি আমার লেখা কাউকে ব্যক্তিগত ভাবে আঘাত করে তার জন্যে আমি ক্ষমা চেয়ে নিলাম)।