Monday, 28 November 2016

ঘোলাজলের রাজনীতি ও কিছু প্রশ্ন – পর্ব ৩


ঘোলাজলের রাজনীতি ও কিছু প্রশ্ন – পর্ব ৩

কিছু বাঁকা প্রশ্নের তীর উড়ে আসছে, আমি নাকি কোনও একটি নির্দিষ্ট পার্টির হয়ে, তাঁদের সপক্ষে কলম ধরেছি। অভিযোগ গুরুতর সন্দেহ নেই, আত্মপক্ষ সমর্থনে ঢাক পেটানোর অভ্যাস কোনও কালেই ছিল না, তবু সবিনয়ে জানাই – আমি কোনও পার্টির বা ভাবনার দলদাস নই, আমি কোনও একটি ইস্যু, আর তার সপক্ষে নেওয়া কিছু পদক্ষেপের প্রশংসা বা সমর্থন করেছি মাত্র, এই আমার অপরাধ। যাক যার যা ভাবনা নিজের কাছে আমি তো কারও ভাবনার পরিবর্তন ঘটাতে পারব না, সেরকম কোনও প্রচেষ্টাও আমার নেই, অতএব একলা মাঝি বেয়ে চল আপন তরী জীবন মাঝে।
  
স্বাধীনতা পরবর্তী ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, ভারতের শাসন ক্ষমতায় সব থেকে বেশি সময় কেটেছে বিশেষ একটি পরিবারের, একটি দলের হাত ধরেই, হ্যাঁ আমি নেহেরু- গান্ধী পরিবারের তথা কংগ্রেসের কথাই বলছি। আমরা অনেকেই জানি ব্যাংক ন্যাশালাইজেশন হয়েছিল ১৯৬৯ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর হাত ধরেই, অর্থনীতিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা সেই সময় থেকেই। আর বিদগ্ধ অর্থনীতিবিদ শ্রী মনমোহন সিংহের পথচলাও সেই সময় থেকেই। সংক্ষেপে একটু দেখে নেওয়া যাক - Chief Economic Adviser হিসেবে ১৯৭২ সালে থেকে ১৯৭৬ সাল, এরপরে ১৯৮২ সাল থেকে ১৯৮৫ সাল অবধি Reserve Bank Governor হিসাবে কাজ করা, Planning Commission Chairman হিসাবে ১৯৮৫ সাল থেকে ১৯৮৭ সাল অবধি দায়িত্বভার সামলানো, তারপর ১৯৯১ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল অবধি Finance Minister হিসাবে কার্যভার গ্রহন, এরপরে ২০০৪ সাল থেকে ২০১৪ সাল অবধি Prime Ministers of India হিসাবে দায়িত্বভার সামলানো। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে Finance Minister এর পদ অলঙ্কিত করেছেন শ্রী প্রণব মুখারজি তথা শ্রী পি চিদাম্বরন মহাশয়দের মতো প্রবাদপ্রতিম অর্থনীতির কিংবদন্তীরা। তাহলে আজ এই অভিযোগ উঠছে কেন যে – গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত এলাকায় ব্যাঙ্কিং পরিষেবা আজও অমিল? এতদিন কি ওনারা এই বিষয়ে অনভিজ্ঞ্য ছিলেন? দেশ কে সুগঠিত করতে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত এলাকায় ব্যাঙ্কিং পরিষেবা ছড়িয়ে দেননি কেন? কেনই বা আজ গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত এলাকায় ব্যাঙ্কিং পরিষেবা অমিল এই ধুয়ো তুলে নোট বাতিলের বিরোধিতা করা হচ্ছে?

আমরা জানি দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুজী কালোবাজারিদের ল্যাম্পপোস্টে ঝোলানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু, বাস্তবে একজন কালোবাজারিকেও ল্যাম্পপোস্টে ঝোলাতে পারেননি তিনি। এরপরেও তো কংগ্রেস শাসনে দীর্ঘদিন ভারতবর্ষ ছিল, কি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিলো কালোবাজারি, জাল নোট বন্ধে?

জাল নোট সংক্রান্ত রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার একটি রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে শেষ সাড়ে তিন বছরে দেশজুড়ে এটিএম এবং ব্যাঙ্ক থেকে বের হওয়া জাল নোটের সংখ্যাটা ১৯ লক্ষ। যার মোট মূল্য ১৪৪ কোটি টাকার কাছাকাছি। অর্থাৎ, গত সাড়ে তিন বছর ধরে এই বিপুল পরিমাণ টাকা ব্যাঙ্ক এবং এটিএম মারফৎ বাজারে ঘোরাফেরা করছিল। শুদু এখানেই শেষ নয়, টাকার হিসেবে একটি তালিকাও প্রকাশ করেছে আরবিআই। সেখানে বলা হয়েছে ওই জাল নোটের মধ্যে বাজারজুড়ে -
১০০ টাকার জাল নোটের সংখ্যা ছিল ৫.৪২ লক্ষ, যার মূল্য ৫৪.২১ কোটি টাকা, ৫০০ টাকার জাল নোটের সংখ্যা ছিল ৮.৫৬ লক্ষ, যার মূল্য ৪২.৮ কোটি টাকা, ১০০০ টাকার জাল নোটের সংখ্যা ছিল ৪.৭ লক্ষ, যার মূল্য ৪৭ কোটি টাকা। নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত কি এই জাল নোট এর রমরমা বাজার কে ধাক্কা দেয় নি?

আমরা সবাই জানি সন্ত্রাসবাদ আজ ভয়ংকরতম হয়ে দেখা দিয়েছে, এর জন্য বহু নিরীহ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। কিন্তু আমরা কি কোন দিন ভেবেছি? এই জঙ্গিরা টাকা কোথা থেকে পায়? আসলে আমাদের প্রতিবেশী কয়েকটি দেশ থেকেই জাল নোটের মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষকতা হয়ে থাকে। বেশ কয়েক বছর ধরে এটা হয়ে চলেছে, যেটা কোনও সরকারেরই অজানা নয়। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের রাষ্ট্রমন্ত্রী কিরেন রিজিজুর বিবৃতি অনুযায়ী পাকিস্তান, নেপাল ও বাংলাদেশ সীমান্ত বরাবর জাল নোট এদেশে প্রবেশ করানোর যে কারবার চলছিল, তা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছে। বিভিন্ন সংবাদ পত্রে মালদহের কালিয়াচক, সীমান্ত এলাকায় গাঁজা, আফিম ইত্যাদির যে চোরা চালান চলছিলো তা আজ পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়েছে। এর কৃতিত্ব কি নোট বাতিলের সিদ্ধান্তের নয়?

যদি একটু তলিয়ে ভাবা যায় তাহলে দেখা যাবে ৮৫ শতাংশ নোট বাতিল করে প্রধানমন্ত্রী যে আঘাত হেনেছেন, তাতে কিন্তু সবচেয়ে ঘায়েল হয়েছে যে অংশ তা বিজেপি’রই প্রধান ভোটব্যাংক বলে পরিচিত, এককথায় মারোয়ারি/ অবাঙালী ব্যবসায়ীরা। তাহলে প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছা নিয়ে সন্দেহ করার কি অবকাশ আছে? প্রভুত অর্থনীতি জ্ঞ্যানের অধিকারী হয়েও দশ বছরে সামান্য সিদ্ধান্ত নিতেও হাত কেঁপেছে পূর্বতন প্রধানমন্ত্রীর সে তুলনায় এই পদক্ষেপ কি সমর্থনযোগ্য নয়? বিরোধী পক্ষ এখন বলছে কালো টাকা উদ্ধার অবশ্যই সমর্থনযোগ্য। কিন্তু যে পদ্ধতিতে ৫০০ এবং ১০০০ টাকার নোট বাতিল করা হয়েছে, তা সমর্থনযোগ্য নয়। তাহলে কি সর্বভারতীয় নিউজ পেপারে বিজ্ঞ্যাপন দিয়ে, নিউজ চ্যানেলে কয়েকদিন আগে থাকতে প্রচার করে নোট বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিলে ভালো হত? আগে থাকতে জানানো হলে ঘর গুছিয়ে নিতে সুবিধা হতো কি? লোক খেপানোর সব রকম প্রচেষ্টা সত্ত্বেও জনমত নিজেদের দিকে ঘোরানো যাচ্ছে না বলে কি জনমোহিনী, চতকদারি রাজনীতির কারবারিরা এত ভীত? এই জন্যে সামান্য বিতর্ক, সমালোচনা তাঁদের সহ্য হচ্ছে না, প্রতিপক্ষ কে নানা ভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা চলছে, এটা অনেকটা ‘ঠাকুর ঘরে কে? আমিতো কলা খাইনি’ এই গোত্রের হয়ে যাচ্ছে না?  

প্রধানমন্ত্রীর এই যুগান্তকারী পদক্ষেপটির পর কত কালো টাকা উদ্ধার হবে বা জাল নোটের কারবারে কতটা টান পড়বে—তা হিসাব কষে হয়তো বলা সম্ভব নয় কিন্তু বড়সড় একটা ধাক্কা যে এই কালো টাকা এবং জাল টাকার কারবারিদের উপর পড়েছে তা তাঁদের পৃষ্ঠপোষক রাজনীতিবিদদের লম্পঝম্প আর বংশবদ মিডিয়ার অবস্থা দেখলে সহজেই অনুমেয়। উপরন্তু এই পদক্ষেপের ফলে প্রধানমন্ত্রী যদি দেশের অভ্যন্তরে অন্তত ৪০ শতাংশ কালো টাকাও উদ্ধার করতে সক্ষম হন—তাহলেই দেশের অর্থনীতি অন্য মাত্রা পাবে। আমরা আম আদমি সেই দিনের অপেক্ষায় বসে আছি। জয় হিন্দ। বন্দেমাতরম।  

(আমার এই লেখা কারও ভাবাবেগে/ স্বার্থে আঘাত দেওয়ার জন্যে নয়, অপিতু এই লেখা আমার মতন আরও কিছু ব্যক্তির মতামতের সপক্ষে যারা দুর্নীতিমুক্ত, শক্তিশালী ভারতবর্ষ কে দেখতে চাই, তাই এই লেখায় কেউ যদি আঘাত পেয়ে থাকেন আমি আন্তরিক ভাবেই দুঃখিত। অধমের ধৃষ্টটা মার্জনীয়, কৃপা করে দেশদ্রোহী/ পার্টি বিরোধী বা ম্যাওবাদির তকমা লাগিয়ে দেবেন না) 

Friday, 25 November 2016

২৬/১১ – এক জ্বলন্ত সংগ্রামের কথা


২৬/১১ – এক জ্বলন্ত সংগ্রামের কথা

২৬/১১ নিছক কোনও সংখ্যা নয়, আপামর ভারতবাসীর মননে এই সংখ্যাটি এলে চোখ ভিজে ওঠে, সাথে সাথে চোয়াল দৃঢ় হয়ে ওঠে দুর্নিবার প্রতিরোধের ও প্রতিশোধের আশায়। ২০০৮ সালের এই দিনে ঘটে যাওয়া নারকীয় ঘটনার বিবরণে আমি যাব না, আমরা সবাই অল্প বিস্তর এই বিষয়ে জ্ঞ্যাত। কিন্তু আজ সকালে বিভিন্ন সর্বভারতীয় নিউজ পেপারের পাতা উল্টে আমি হতাশ, যারা আত্মবলিদান দিয়ে গেলেন – মেজর সন্দীপ উন্নিকৃষ্ণন, হেমন্ত কারকারে, বিজয় সালাস্কার, অশোক কামটে বা তুকারাম আম্বলে এবং সর্বোপরি হামলায় নিহত বা আহতদের প্রতি কোনও শ্রদ্ধাজ্ঞ্যাপন নেই, কোনও খবরও নেই যে কেমন আছে বীর শহীদদের পরিবার পরিজন। শুদু পাতা ভরতি করে লেখা নোট বাতিল ও সেই নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির খেয়োখেয়ি! মিডিয়া ও রাজনৈতিক দলগুলি এটাই দেখাতে ব্যাস্ত যে নোট বাতিলের ফলে দেশের অর্থনীতি কিভাবে পিছিয়ে পড়ছে বা শাসকদল নিজের আখের কিভাবে গুছিয়ে নিয়েছে। সাধু উদ্যোগ সেবিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই, মিডিয়া ও রাজনৈতিক দলগুলির আম আদমির প্রতি যে দায়বদ্ধতা তা সেলামের যোগ্য। তবে কেন জানিনা মনে পরে যাচ্ছে চুঁচুড়া স্টেশনে ঘুরে বেড়ানো এক শীর্ণকায়, অভাবী কিন্তু আভিজাত্যের গরিমায় ভরপুর এক জন বয়স্কা মহিলার কথা, যিনি শুদু স্টেশনে হাত বাড়িয়ে চুপ করে বসে থাকতেন, কিন্তু কোনদিনও তাঁকে কাউকে কিছু দিতে অনুরোধ করতে দেখিনি। মনে কৌতূহল জাগায় চেষ্টা করেছিলাম ওনার সাথে কথা বলে যদি কিছু তথ্য জানা যায়, কিন্তু পারিনি। উনি ওনার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে এড়িয়ে গেছেন পুরো ব্যাপারটা। আশেপাশের কয়েকজনের থেকে শোনা – বড় ঘরের গৃহবধূ ছিলেন তিনি, স্বামী মারা যাবার পর তিন ছেলে সব সম্পত্তি হাতিয়ে নিয়ে বাড়ী থেকে বের করে দিয়েছে ওনাকে, যদিও ছেলেগুলি সব নাকি শিক্ষিত এবং নিজ জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত। তাই মা কে জীবন থেকে বহিস্কার তাদের সাজে। যাক সে কথা, আজ আমাদের ভারতমাতার থুড়ি ভারতমাতা বললে তো আবার সেকুলার বাঙ্গালীর আঁতে লাগবে তাই দেশ মাতা এটাই ঠিক আছে, কি বলেন? যাক প্রসঙ্গে ফিরে আসি – আমাদের দেশ মাতার ও কত সুযোগ্য সন্তান (কেউ সৎ রাজনৈতিক, অবশ্য কোনও রাজনৈতিক নেতা/ নেত্রীদের নিজেকে অসৎ বলতে তো দেখলাম না, কেউ জাগরুক, নির্ভীক সাংবাদিক, সত্য তুলে ধরাই যাঁদের এক মাত্র লক্ষ্য, এছাড়া বাকিদের না হয় বাদ দিলাম। লিখতে গেলে পাতাও শেষ হয়ে যাবে) থাকতেও দেশ মায়ের একি হাল! আজও কেন দেশে এত দুঃখ, কষ্ট, এত দুর্নীতি, স্বার্থের হানাহানি? যে দেশ মাতার এত সব সুযোগ্য সন্তান সেই দেশ আজ এত সমস্যায়? না থাক প্রশ্ন করে লাভ নেই, দেশদ্রোহীর তকমা লেগে যেতে পারে। তার থেকে আমরা পিপুফিশুর দলে নাম লেখাই, কমসে কম এই প্রবাদটি সত্যি তো হবে – আপনি বাঁচলে বাপের নাম। 

(২০০৮ সালের ২৬/১১ র হামলায় নিহত সকল আত্মার শান্তি কামনা করি, সাথে আশা করি দেশ তাঁদের বলিদানকে ভুলবে না, এই হামলার পিছনে দোষীরা পৃথিবীর যে প্রান্তেই লুকিয়ে থাকুক না কেন তাঁদের খুঁজে বের করে চরম শাস্তি দেওয়া হবে। জয় হিন্দ, বন্দেমাতরম।) 


Thursday, 24 November 2016

লাও! শেষে পর্বতের মূষিক প্রসব হবে না তো?



লাও! শেষে পর্বতের মূষিক প্রসব হবে না তো?

“কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়, ও ভাইরে ও ভাই, কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়। আমি যেই দিকেতে চাই, দেখে অবাক বনে যাই”, হীরক রাজার দেশে এই সিনেমাটি ছোটবেলায় কতবার দেখেছি, কিন্তু এর পিছনে লুকিয়ে থাকা শ্লেষ, উদ্দেশ্য একটু বড় হয়ে বুঝতে পেরেছিলাম। সে যাই হোক এই গানটি মনে আসার পিছনে কারণ একটাই – একটি বহুল প্রচলিত নামি নিউজ পেপারে (এই সময় এ) প্রকাশিত হওয়া একটি সংবাদ। 

পাঠকের সুবিধার্থে জানাই -  স্যুইস সংস্থা ক্রেডিট স্যুইস গ্রুপের করা একটি সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে যে দেশের উচ্চবিত্ত সম্প্রদায় বর্তমানে দেশের মোট সম্পত্তির ৫৮.৪ শতাংশের অধিকারী, ২০১৪ সালের তুলনায় দ্রুতহারে সম্পত্তির পরিমাণ বেড়েছে দেশের ১ শতাংশ সর্বোচ্চ ধনী সম্প্রদায়ের। অর্থাৎ ২০১৪ সালে যা ছিল ৪৯ শতাংশ, চলতি বছরে তা দাঁড়িয়েছে ৫৮.৪ শতাংশে। মানে দেশের শীর্ষ ধনী সম্প্রদায়ের সম্পত্তি বৃদ্ধির হার ক্রমবর্ধমান, অন্যদিকে চিত্রটি বড়ই করুন - দেশের নিম্নবিত্তরা মোট জাতীয় সম্পত্তির মাত্র ২.১ শতাংশের অধিকারী বলে জানানো হয়েছে সমীক্ষায়। 

তাহলে অতঃকিম! ঘোড়ার ডিম? কালো টাকার মালিক যে দেশের আম আদমি নয় এটা কাউকে বলে দিতে হবে না। কালো টাকা যাদের হাতে, তাঁদের এহেন শ্রীবৃদ্ধি কি কাম্য? আমরা চুনোপুঁটি থেকে রাঘববোয়াল সবার বিনাশ চাই, তবেই তো দেশের অগ্রগতি সম্ভব। তাই আজ বোধহয় কালো টাকার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের পাশে থাকা আম আদমির এটাই আকুতি এত কষ্ট, এত ত্যাগ সব জলে যাবে নাতো? আমরা অধীর আগ্রহে দিন পরিবর্তনের আশায় রইলাম, আর যদি সাধারণ মানুষের আশাভঙ্গ হয় তবে ইতিহাস সাক্ষী সময়ের চাকা এক জায়গায় থেমে থাকে না, পরিবর্তন আসবেই আজ নয় কাল। জয় হিন্দ, বন্দে মাতরম। 

Wednesday, 23 November 2016

চোউউউউউপ গরিব রো রাহা হ্যায়



চোউউউউউপ গরিব রো রাহা হ্যায় 

যে গরিব জনগনের জন্যে বিরোধী নেতা/ নেত্রীবৃন্দের চোখে ঘুম নেই, তাঁরা ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন বিগত ১৫দিন ধরে, শেষে দেখা যাচ্ছে রাতারাতি বড়লোক হয়ে গিয়েছে গরিব থুড়ি গরিবের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট।তাও আবার ৫০০, ১০০০ টাকা বাতিলের পরে? তাহলে নোট ব্যান আখেরে গরিবের ভালো করেছে, এই প্রশ্ন মাথায় আসতেই পারে? না এটা কুৎসা বা প্রলাপ নয়, আজ একটি সর্বভারতীয় কাগজে (সন্দেহ থাকলে ebla.in এ গিয়ে সত্যটা যাচাই করে দেখতে পারেন) ।  সেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে - জিরো ব্যালেন্স অ্যাকাউন্টে মাত্র ১৩ দিনে জমা পড়েছে ২১ হাজার কোটি টাকা, যেখানে সারা দেশে জন ধন প্রকল্পের অ্যাকউন্ট রয়েছে ২৫ কোটি ৫১ লক্ষ, এই সব অ্যাকাউন্টে প্রধানমন্ত্রী নোট বাতিলের ঘোষণা করার আগে মোট জমা ছিল ৪৫,৬৩৬ কোটি ৬১ লক্ষ টাকা, আর ৯ নভেম্বরের পরে মোট জমা টাকার পরিমাণ ৬৬ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা। আর ওই সংবাদ সূত্রের খবর, গরিবের অ্যাকাউন্টে টাকা জমা পড়ার পরিমাণে দেখা গিয়েছে সবার উপরে পশ্চিমবঙ্গ, আর  ঠিক এর পিছনেই রয়েছে কর্ণাটক।

তাহলে কিসের এত চেঁচামিচি, হই হট্টগোল, আন্দোলন এই নিরেট মাথায় ঢুকছে না। তাহলে কি আমরা গান্ধিজীর তিন বাঁদরের মতো কান, চোখ ও মুখ বন্ধ রাখব?

Tuesday, 22 November 2016

আবার আমাদের জওয়ানদের মুণ্ডচ্ছেদ, এই হত্যামিছিল থামবে কবে?


 আবার আমাদের জওয়ানদের মুণ্ডচ্ছেদ, এই হত্যামিছিল থামবে কবে?

২০১৩ সালের জানুয়ারী মাস, কাশ্মীরের কৃষ্ণগতি সেক্টরে হামলা চালিয়েছিল পাকিস্থানের বিশেষ সীমান্ত বাহিনী ব্যাট (বর্ডার অ্যাকশন টিম), তাতে মৃত্যু হয়েছিল ল্যান্স নায়েক হেমরাজ ও ল্যান্স নায়েক সুধাকর সিংহের, দুই জওয়ানেরই দেহ ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিল পাক সেনা। হেমরাজের মাথাও কেটে ফেলেছিল তারা। ২০১৬ সাল, ২৯শে সেপ্টেম্বর কাশ্মীরের মছিল সেক্টরে আবার হামলা সেই পাক (না নাপাক) সীমান্ত বাহিনী ব্যাটের সেবারেও মনদীপ সিংহ নামে এক জওয়ানের দেহ ছিন্নভিন্ন করে, মুণ্ডচ্ছেদ করে পালিয়ে গিয়েছিল পাকিস্থানি জওয়ানরা। আবার সেই মছিল সেক্টরেই পাক সীমান্ত বাহিনী ব্যাটের হামলায় মৃত্যু হয়েছে তিন সেনা জওয়ানের। যার মধ্যে রাজস্থানের বাসিন্দা প্রভু সিংহের দেহই বিকৃত করে দিয়েছে পাক হানাদার বাহিনী, মুণ্ডচ্ছেদ করা হয়েছে তাঁর।

বারবার ঘটে চলা এই বর্বরতার জবাব কি? রাষ্ট্রপুঞ্জে অভিযোগ, পৃথিবীর ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলির কাছে পাকিস্থানকে বশে রাখার অনুনয়/ নিবেদন না নাপাক পাকিস্থানের মুখের উপর যোগ্য জবাব? যেটা তাঁরা ভালমতোই বোঝে। বৃহত্তর ইস্যুতে আন্দোলনরত জনদরদি নেত্রী, আম আদমির নেতা তথা সর্বহারার সাথী, প্রমুখ সকল নেতা/ নেত্রীবৃন্দের কাছে সবিনয় নিবেদন এই বিষয়ে আপনাদের অবস্থান ঘোষণা করলে দেশবাসী আশ্বস্ত হয়। প্রায় ৭০ বছর ধরে চলে আসা এই ক্যান্সারের কি কোনও নিরাময় নেই? অন্ততও এই ইস্যুতে কি আমরা একজোট হতে পারি না? জবাব পাওয়া যাবে কি?

Sunday, 20 November 2016

ঘোলাজলের রাজনীতি ও কিছু প্রশ্ন – পর্ব ২


ঘোলাজলের রাজনীতি ও কিছু প্রশ্ন – পর্ব ২

বর্তমান পরিস্থিতিতে ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র বেঁচে থাকলে তিনি “কমলাকান্তের দপ্তর”- এর সংশোধিত ও পরিমার্জিত সংকলন বের করতেন এবিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। বিশেষত ‘মনুষ্য ফল’ সম্পর্কে তাঁর যে ধারণা হয়েছিলো, বর্তমানে তাহা আরও সমৃদ্ধ হতো। সত্যি বাঙ্গালীর ন্যায় পালটিবাজ, বহুরুপী জাতি দুটি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। না এই ধারণা আমার একার নহে, আমার মতো কম বেশি অর্ধশিক্ষিত, আমআদমির তো বটেই, এখন প্রশ্ন হল এই দিব্য উপলব্ধি হল কিভাবে?

গত কয়েকদিন ব্যাংকের লাইনে দাঁড়িয়ে, ট্রেনে বাসে, চায়ের আড্ডায়, সব জায়গায় শিক্ষিত, মহাজ্ঞ্যানি বাঙ্গালীর তর্কালাপ, তদুপরি বিবিধ খবরের কাগজ (কি সব ক্যাচ লাইন তাঁদের – জনশত্রু, ভগবান কেন শয়তানকেও ভয় করে না, পড়তে হয় নইলে পিছিয়ে পরতে হয় ইত্যাদি ইতাদি), সর্ব ভারতীয়, নামি দামী নিউজ চ্যানেলের অমৃত বানী শুনে সব ঘেঁটে ঘ। ধাতস্ত হতে বেশ কিছুটা টাইম লেগে গেলো, তারপরেও এই মোটা বুদ্ধিতে বেশ কিছু প্রশ্ন রয়েই গেলো। 

প্রশ্ন-১) নিউজ পেপার ও চ্যানেলে প্রকাশ দেশীয় ক্যারেন্সির (জাল ও আসল সহ) চোদ্দ আনাই হল বড় নোট, মানে ৫০০ ও ১০০০ টাকার। অথচও যোজনা কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী দেশের বেশিরভাগ লোকই দিনে ২০টাকাও খরচ করতে পারে না। তাহলে ৫০০, ১০০০ টাকার নোটের অসাধু ব্যাবহারকারী কারা? নোট বাতিলে কাদের কষ্ট হচ্ছে বেশি?   

প্রশ্ন-২) নোট বাতিলের স্বপক্ষে অর্থ সচিবের যুক্তি – গত পাঁচবছরের দেশের অর্থনীতিতে হাই ভ্যালু নোটের সংখ্যা ৪০ শতাংশ বেড়েছে, যেখানে অর্থ নীতির বহর বেড়েছে ৩০ শতাংশ। দেশে চালু ৫০০ টাকার নোটের সংখ্যা ৭৬ শতাংশ ও ১০০০ টাকার নোটের সংখ্যা ১০৯ শতাংশ, অথচও রিজার্ভ ব্যাংক বাজারে ছেড়েছে ৫০০ টাকার নোট – ১৬৫০ কোটি এবং ১০০ টাকার নোট – ৬৭০ কোটি। তাহলে এবার দেখে নেওয়া যাক দেশে কত কোটি টাকার বেআইনি ও জাল টাকার সমান্তরাল অর্থনীতি, যা বৈধ অর্থনীতির সাথে সমান ভাবে চালু রয়েছে। ৫০০ টাকার নোটের সংখ্যা ১৬৫০ কোটির মানে বৈধ ৮ লক্ষ ২৫ হাজার কোটি টাকা চালু রয়েছে, ১০০০ টাকার নোটের সংখ্যা ৬৭০ কোটির মানে বৈধ ৬ লক্ষ ৭০ হাজার কোটি টাকা চালু রয়েছে। এবার হাজার টাকার নোটের সংখ্যা ১০৯ শতাংশ বৃদ্ধির মানে হল – বৈধ ও অবৈধ মিলিয়ে ১০০০ টাকার ক্ষেত্রে ভারতীয় অর্থনীতিতে ১৪ লক্ষ ৩০০ কোটি টাকা চালু রয়েছে। অর্থাৎ তথ্য থেকে এটা পরিস্কার যে, ৫০০ টাকা ও ১০০০ টাকার নোটের বৈধ অর্থ যেখানে ৯ লক্ষ ৫৫ হাজার কোটি টাকা, সেখানে এই দুই ক্যারেন্সির নোট (বৈধ ও অবৈধ) মিলিয়ে এই অর্থের পরিমান ১৯ লক্ষ কোটি টাকার ও বেশি। এই অবস্থা কি উদ্বেগের নয়? এর বিরুদ্ধে আশু লড়াই কি দরকারি ছিল না? তাহলে যারা নোট বাতিলের বিরোধিতা করছেন তাঁরা কি জেনে বুঝেই জাল টাকার কারবারিদের সুবিধা করে দিচ্ছেন? না কি আরও বৃহৎ স্বার্থে ঘা লেগেছে তাঁদের? 

প্রশ্ন-৩) বর্তমান পরিস্থিতিতে আমআদমি অনেক কষ্টের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, দৈনন্দিন জীবনে নানা রকম বাঁধাবিপত্তির সম্মুখীন হতে হচ্ছে, এই তথ্যটি কি প্রধানমন্ত্রীর অজানা? প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক জীবন কি সুরক্ষিত? না কারন যত তাড়াতাড়ি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, ব্যাংকে, এটিএমে নগদ টাকার যোগান স্বাভাবিক না হবে, ততই আমআদমি প্রধানমন্ত্রীর বিরোধিতা করবেন যার ফল আগামী নির্বাচনের ভোট বাক্সে প্রতিফলিত হবে, তার সাথে যোগ দেবে ভ্রষ্ট বিরোধী নেতানেত্রী, জাল ও কালো টাকার কারবারিরা, যাদের মৌচাকে ঢিল মেরেছেন প্রধানমন্ত্রী। হয়তো এই প্রধানমন্ত্রীকে তাঁর ভাইপো, মেয়ে জামাই, ছেলের বা ভাইদের স্বার্থ রক্ষা করতে হচ্ছে না তাই তিনি এত বেপরোয়া? ৭০ বছরের ব্যাধি ৫০ দিনে নির্মূল করা না গেলেও কিছুটা উপশম হবে এই আশা করা যেতেই পারে। কি বলেন ব্যাস্ত জননেত্রী ও নেতাবৃন্দ তৎসহ প্রতিবাদী বুদ্ধিজীবী মহল?   

প্রশ্ন-৪) দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুজী কালোবাজারিদের ল্যাম্পপোস্টে ঝোলানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু, বাস্তবে একজন কালোবাজারিকেও ল্যাম্পপোস্টে ঝোলাতে পারেননি তিনি। সেই দেশে বর্তমানে কালোবাজারি, জালনোটের কারবারি বা অন্যান্য অসাধু বাবসায়িদের কি হাল? খবরের কাগজ ও নিউজ চ্যানেলে প্রকাশ, সীমান্তবর্তী এলাকাগুলিতে গরু পাচার, সোনা পাচার সহ যাবতীয় চোরাচালান প্রায় বন্ধ, কারন হিসেবে উঠে আসছে সেই ৫০০, ১০০০ টাকার প্রসঙ্গ। তাহলে কি ধরে নিতে হবে চোরাচালান বন্ধ হওয়াতে এক শ্রেণীর নেতা/ নেত্রী ও তাঁদের সাঙ্গোপাঙ্গ দের অসুবিধা হয়েছে আর সেই জন্যেই এত গেলো গেলো রব? এছাড়া দেশের বিভিন্ন্য জঙ্গি সংগঠন আজ মহা বিপাকে, কারন সেই বাতিল ৫০০, ১০০০ টাকার গল্প, কয়েকদিন আগে আবার একটি সর্ব ভারতীয় নিউজ পেপারে দেখলাম ৫০০, ১০০০ টাকার নোট পুড়িয়ে চা করে খেয়েছে উত্তর পূর্বের কোনও এক জঙ্গি সংগঠন। সেই একই ভাবে তোলাবাজ নেতা নেত্রী, বহু স্বনামধন্য চিকিৎসক, উকিল, অসাধু ব্যাবসায়ি আজ বিপাকে। ইনকাম ট্যাক্সের অতর্কিত হানায় উঠে আসছে কালো টাকার খনি। এছাড়া জাল নোটের কারবারিদের মাথায় হাত কিভাবে পড়েছে সে সম্পর্কে আজ সাধারণ মানুষ অবহিত, এছাড়াও কাশ্মীরে যেভাবে নিরাপত্তাবাহিনীর উপর পাথর ছোড়া, আক্রমণের ঘটনঅ্যা হ্রাস পেয়েছে তার সম্ভাব্য কারন হিসেবে উঠে আসছে সেই বাতিল ৫০০, ১০০০ টাকার প্রসঙ্গ। তাহলে এত হট্টগোল, এত প্রতিবাদ কর্মসূচী এই শ্রেণীর লোকেদের স্বার্থরক্ষার জন্যে নয়তো? আজ অনেকের মনেই এই প্রশ্ন জেগেছে তার প্রতিফলন আড্ডায়, মজলিশে শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। 

প্রশ্ন-৫) সাধারণ মানুষ যথেষ্ট বিপাকে এই বিষয়ে দ্বিমত নেই, কিন্তু লাইনে দাঁড়ানো ১০০ জনের মধ্যে মুষ্টিমেয় কিছু জনের ব্যক্তিগত সমস্যাকে ইচ্ছা করে ফোকাস কেন করা হচ্ছে? কেন বেশিরভাগ মানুষ যারা এই নোট বাতিলের স্বপক্ষে তাঁদের কথা তুলে ধরা হচ্ছে না কেন? ইচ্ছাকৃত ভাবেই কি তৈরি করা হচ্ছে অসন্তোষ/ মতামত যা আম আদমির বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে? এতে স্বার্থ কোন শ্রেণীর সেটাও খুঁজে বের করা দরকার।

প্রশ্ন-৬) যেসব দিদিমনি, দাদাভাইরা আজ আমআদমির দুঃখে, কষ্টে সমব্যাথি তাঁদের কাছে জানতে ইচ্ছে করে, চিটফ্যান্দে সর্বশ্রান্ত গরীব জনগণের জন্যেও কি একইভাবে তাঁদের প্রান কাঁদে? কিংবা তোলাবাজী, জাল নোট, চোরাচালান এসব কাজের বিরুদ্ধেও সমভাবে গর্জে ওঠেন? আজ দেশের অসংগঠিত ও সংগঠিত উভয় ক্ষেত্রের শ্রমিক, কর্মচারীদের দুরাবস্থা অনেকেরই জানা, কিভাবে তাঁরা সিস্টেমের জাঁতাকলে নিষ্পেষিত, শোষিত হচ্ছে তাও অজানা নয় জনপ্রতিনিধিদের। কিন্তু এই নিয়ে ব্যাপক অর্থে কার্যকরী আন্দোলন কতটা হয়েছে বা হচ্ছে? কে জানে অতীতের ঘটনাবলী তো সেই সাক্ষ্য দেয় না, তাহলে কি তথাকথিত জনদরদি নেতা/নেতৃবৃন্দ শুদুমাত্র বিরোধী আসনে বসার মহান দায় পালন করে চলেছেন?   

ভারতবাসী হিসেবে আমাদের দুর্ভাগ্য আমরা জাতীয় স্বার্থেও একজোট হতে পারি না। তাই বোধহয় সারজিক্যাল স্ট্রাইকের পরে কোনও জননেতা প্রমানের ভিডিও প্রকাশের দাবি তোলেন, অতীতে ১৯৬২ সালে চীন ভারত যুদ্ধে কোনও রাজনৈতিক দল প্রচার করেছিলো যে চীন নয় ভারতই চীন কে আক্রমণ করেছে, এরকম আরও কত কি শোনা যায়? চিটফ্যান্দ থেকে জাল নোট, চোরাচালান সব কিছু থেকেই হাত ধুয়ে ফেলেতে উদ্যোগী রাজনৈতিক দলগুলি, সবাই অপরের উপর দোষ চাপাতে ব্যাস্ত – এইসব অনৈতিক কাজকর্ম আমাদের পার্টি অনুমোদন করে না, তাহলে কি পার্টির বিনা অনুমোদনে, ছত্রছায়ায় চলে এই সব কাজকর্ম? কি অদ্ভুত দেশ আমাদের তাই না? আস্তিনের সাপেদের নির্ভরযোগ্য আশ্রয়স্থল বোধহয় আমাদের এই ভারতবর্ষ। অনেকের মুখে শোনা যাচ্ছে আরে আগে দেশের বাইরে চলে যাওয়া কালো টাকা উদ্ধার হোক পরে দেশের ভিতরে জমে থাকা কালো টাকা উদ্ধার করুক সরকার। দেশের বাইরে কালো টাকা উদ্ধারে নিশ্চয়ই আরও সক্রিয় হতে হবে রাষ্ট্রকে, কিন্তু সেই আওয়াজ/ দাবি কি বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠিত করতে গেলে যে শক্তিশালী ভারতের প্রয়োজন সেটা কি আমরা বুঝতে পারছি? ভিক্ষার আবেদনে বা অনুনয়ে কালো টাকা হয়তো আসবে না তার জন্যে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী, প্রভাবশালী দেশ হয়ে উঠতে হবে আর তার জন্যে দেশের ভিতরে চলে আসা ৭০ বছরের ক্যান্সার আগে সারান দরকার। এটা ভুলে গেলে চলবে না বিদেশের মাটিতে বা আকাশে কালো টাকা জন্মায় নি, এই বিপুল পরিমান কালো টাকা সৃষ্টি হয়েছে দেশের অভ্যন্তরেই, আর সেটাই বিদেশের মাটিতে পাচার করা হয়েছে। আজ যদি কালো টাকার উৎসে আঘাত হানা যায় তাহলে ভবিষ্যতে হয়তো কালো টাকা বিদেশে পাচার করার প্রবণতা হ্রাস পাবে।  আজ ৫০০, ১০০০ টাকার নোট বাতিলের সুবাদে আমরা জানতে পারছি এলাকার স্বনামধন্য চিকিৎসক, উকিল, ব্যাবসায়িদের প্রকৃত চেহারা, আয়কর ফাঁকি দিয়ে তাঁরা কোন নতুন ভারতবর্ষ গড়ে তুলছেন? আর তাঁদের স্বার্থ রক্ষায় কারা আজ বেশি তৎপর দেশবাসী সেটা বুঝতে পারছে।

আমরা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কত রকম কথা বলি, কিন্তু আমরা কি কখনও ভেবে দেখেছি এই জঙ্গিরা টাকা কোথা থেকে পায়? আসলে আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলি থেকেই জাল নোটের মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষকতা হয়ে থাকে, এবং বিগত কয়েক দশক ধরে এটা হয়ে চলেছে, যারা নোট বাতিলের স্বপক্ষে গলা ফাটাচ্ছেন তাঁরা কি এর আগে এই ইস্যুতেও এইভাবে আন্দোলন গড়ে তুলেছেন? গত ৮ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জাতির উদ্দেশে ভাষণে কারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলেন -  শুধু কি কালোবাজারি, দুর্নীতিগ্রস্ত, কালো টাকার আড়তদার? মাথায় সেদিন আকাশ ভেঙেছিল সন্ত্রাসের নেপথ্যে থাকা মদতদারদেরও। তাই সন্ত্রাসবাদের পাশাপাশি ভারতের অর্থনীতিকে দুর্বল করার জন্যে যারা জাল নোটের কারবারি তাঁদের ও ভালো রকম ধাক্কা দিয়েছে এই নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত, যার কমবেশি খবর নিউজ পেপারে ও নিউজ চ্যানেলে প্রকাশিত হয়েছে। তাই যেসব ভারতীয় নাগরিকরা আইনমাফিক আয়কর দেন, সমস্ত রকম দুর্নীতিকে ঘৃণা করেন, সন্ত্রাসবাদ, জাল নোট প্রভৃতি বিভিন্ন ইস্যুতে সোচ্চার তাঁরা যদি কিছু কষ্ট সহ্য করে কালো টাকা, জাল নোটের আতঙ্কমুক্ত এক সমাজের ছবি দেখতে চায় তাঁতে বিরোধী পক্ষের উষ্মার কোনও কারন আছে কি? তাই সবিনয় নিবেদন মুষ্টিমেয় কিছু লোকের ব্যক্তিগত অসুবিধা, মতামত কে সবার মতামত বলে চালিয়ে দেবেন না।

(আমার এই লেখা কারও ভাবাবেগে/ স্বার্থে আঘাত দেওয়ার জন্যে নয়, অপিতু এই লেখা আমার মতন আরও কিছু ব্যক্তির মতামতের সপক্ষে যারা দুর্নীতিমুক্ত ভারতবর্ষ কে দেখতে চাই, তাই এই লেখায় কেউ যদি আঘাত পেয়ে থাকেন আমি আন্তরিক ভাবেই দুঃখিত। অধমের ধৃষ্টটা মার্জনীয়, কৃপা করে দেশদ্রোহী/ পার্টি বিরোধী বা ম্যাওবাদির তকমা লাগিয়ে দেবেন না) 

Sunday, 13 November 2016

ঘোলাজলের রাজনীতি ও কিছু প্রশ্ন


ঘোলাজলের রাজনীতি ও কিছু প্রশ্ন

গতকাল আমিও ব্যাঙ্কে গিয়েছিলাম কয়েকটি ৫০০, ১০০০ নোট জমা দিতে, লম্বা লাইন দেখে একটু বিরক্তি হলেও পরে নিজেরই ভালো লাগলো শুনে যে আমার আগের বয়স্ক কাকুটিয়ও প্রায় দুই ঘণ্টা আগে এসে লাইনে দাঁড়িয়েছে। এবং তিনি অকুণ্ঠভাবেই সমর্থন জানাচ্ছেন কালো ও জাল টাকার বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে। না ব্যতিক্রম যে ছিল না তা নয়, অল্প কিছু ডাইনোসর প্রজাতির লোক (অবশ্যই হরিদাস বাঙালী) চিৎকার/ অভিযোগ, সরকারকে গাল পাড়ছিলেন, কিন্তু নিজেরাই হাস্যাস্পদ হচ্ছিলেন বাকি লোকেদের কাছে। বেশ কিছুটা সময় পরে নির্ধারিত ৪০০০ টাকা নিয়ে বেরিয়ে এলাম। এই পর্যন্ত ঠিক আছে, কিন্তু টিভিতে অমুক দিদি, অমুক দাদার ক্ষোভ, বিপ্লবের বুলি শুনে  মনে এটাই প্রশ্ন এলো - ৫০০, ১০০০ টাকার নোট বাতিল করাতে আমাদের দাদা, দিদিদের থুড়ি নেতা/নেত্রীদের চোখে ঘুম নেই? আম আদমির হেঁশেল কিভাবে চলবে, কিভাবে দুবেলা দুমুঠো অন্ন তাঁদের মুখে উঠবে এই চিন্তায় কেন তেনারা প্রানপ্রাত করে চলেছেন? আজ হঠাৎ কেন আম আদমির জন্যে এত দরদ? কিন্তু কোনও রাজনৈতিক দল কেই দেখলাম না লাইনে দাঁড়ানো আম আদমির জন্যে পানীয় জল/ চা, বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্যে ছায়া/ বসার বাবস্থা, গরীব অশিক্ষিত লোকে দের জমার স্লিপ লিখে দেওয়ার কোনও ক্যাম্প করতে? অবশ্য শুনলাম ব্যাঙ্কের সামনে জায়গায় জায়গায় বুথ খুলে প্রতিবাদ কর্মসূচী হবে। সাধু উদ্যোগ মানতেই হবে – কিন্তু সেই সব দিদি, দাদাদের কাছে কিছু প্রশ্ন রাখতে চাই, আশা করি ওনারা জবাব দেবেন নিশ্চয়ই? 

১) আম আদমি লম্বা লাইন দিয়ে সিনেমার টিকিট কাটতে পারে, জিওর সিম নিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে পারে, রবিবারে খাসীর দোকানে লাইন দিতে পারে, পুজো, পার্বণে মোডের দোকান, রেস্তোরাঁতে লাইনে দাঁড়াতে পারে, ভোটের লাইনে আপনাদের মতো নেতা/ নেত্রীদের জেতাতে লাইনে দাঁড়াতে পারে আর কয়েক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে টাকা জমা/ পরিবর্তন করাতে পারবে না? আলবাত পারবে, এই আম আদমিই কিন্তু এর আগেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইন দিয়ে রেশন দোকানে ডিজিটাল কার্ড, আধার কার্ড করিয়েছে। তাহলে আজ ঠিক আপত্তিটা কোথায়? এই উদ্যোগ নেওয়ার সৎ সাহস আপনারা দেখাতে পারেননি না ব্যক্তিগত (দলগত) স্বার্থে ঘা পড়েছে তাই?  

২) দেশে কালো টাকা, জাল টাকার বিরুদ্ধে আপনাদের (ব্যক্তিগত/ দলগত) অবস্থান ঠিক কোথায়? এর আগে আপনাদের ঘোষিত কর্মসূচী কি ছিল বা এখনই বা কি আছে? 

৩) যে সকল নেতা/ নেত্রীরা বিদেশের কালো টাকা ফেরাতে এত তৎপর! তাঁদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন গত ৭০ বছরে কালো টাকার বিরুদ্ধে তাঁদের জিহাদের নমুনা কি ছিল? তাঁরা কি পদক্ষেপ নিয়েছেন এই উদ্দেশ্যে? যে তথাকথিত কালো টাকা সুইস ব্যাঙ্কে জমা আছে বলে এত হইচই, সেই সম্বন্ধে কি তাঁরা আজ জানলেন? এর আগে আপনারা কি শীতঘুমে ব্যাস্ত ছিলেন?

প্লীজ দোহাই আপনাদের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, ব্যক্তিগত স্বার্থের কারনে সাধারণ আম আদমি কে বলির বকরা করবেন না। যারা স্বেচ্ছায় এই কষ্ট মেনে নিতে প্রস্তুত তাঁদের দলে টানার চেষ্টা না করলেও কিছু সুবিধাবাদী, অসাধু লোকেদের নিজেদের পতাকার তলায় ঠিকই পেয়ে যাবেন। বিপ্লব তাঁদের নিয়ে করতে পারেন।

যদি রাষ্ট্র এই পদক্ষেপ না নিত তাহলে হয়তো আমরা জানতে পারতাম না –

১) কোন সুপুত্র তার অসহায় বৃদ্ধা মা বাবা কে এতদিন দেখে নি, অথচও এখন গিয়ে বলছে – এই নাও টাকা কাল সকাল সকাল ব্যাঙ্কে জমা করে দিও, বাবা কে ভালো ডাক্তার দেখিয়ো, দরকার পরলে আরও কিছু টাকা নাহয় আমি দিয়ে দেবো।

২) সমাজের হোয়াইট কালার উচ্চ শ্রেণীর লোকেরা যারা এতদিন সমাজের নীচের তলার লোকেদের তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে দেখে এসেছে আজ তাঁদের উপকারের চেষ্টার কোনও খামতি নেই? উদ্দেশ্য একটাই যদি তাঁদের হাত ধরে কিছু কালো টাকা সাদা করে নেওয়া যায়, এরজন্যে উপঢৌকনের ডালিও প্রস্তুত।   

৩) দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত কত বেহিসাবি টাকা জমা পড়েছে? আর এই অর্থ বর্ষে কত? যতদূর জানি ৬৭ হাজার কোটি টাকা, তাহলে? 

৪) অসাধু ব্যাবসায়িরা তাঁদের কর্মচারীদের আগামী ৬ এমন কি ১২ মাসের বেতনের টাকাও ক্যাশে অগ্রিম কেন দিয়ে দিচ্ছেন? অথচও পূর্বে এই কর্মচারী/ শ্রমিক ভাইটি পিতা বা মাতার চিকিৎসার জন্যে কিছু টাকা ধার/ অগ্রিম চেয়েও পায়নি।  

৫) যে ধনী আত্মীয়টি আগে অবহেলায় গরীব আত্মীয়ের মুখদর্শন করতো না সেই এখন তাঁকে মাখন লাগাচ্ছে যদি আড়াই লাখ করে কিছু টাকা সাদা করে দেয় সে। তার জন্যে অবশ্য যথাযথ মুল্য দিতে ধনী ব্যক্তিটি প্রস্তুত।

এরকম অনেক উদাহরন আশেপাশে পাওয়া যাবে একটু চেষ্টা করলেই।    

এটা ঠিকই সাধারণ মানুষের অনেক অনেক কষ্ট হচ্ছে, যেটা তাঁরা হয়তো দেশের স্বার্থের খাতিরে মুখ বুজে মেনেও নিচ্ছেন। কিন্তু অনেক বেশি কষ্ট তাঁদের হচ্ছে যারা কালো টাকা, জাল টাকার মধু এতদিন পান করে এসেছেন। এবং তাঁরা এই কথা ভেবেও আতঙ্কিত সঞ্চয় করে রাখা সেই মধুভাণ্ড রক্ষা কিভাবে করবেন? তাই এই প্রবাদ বোধ হয় আজ একদম ঠিক যে - “দেশের মধ্যে যখন চোর, দস্যু, ডাকাত, রাজদ্রোহীরা চিৎকার, চেঁচামিচি করবে, জানবে রাজা সুশাসন করছে -  মহামতি চাণক্য”।

(আমার এই লেখা কারও ভাবাবেগে/ স্বার্থে আঘাত দেওয়ার জন্যে নয়, অপিতু এই লেখা আমার মনের কষ্টের, দ্বিচারিতার বিরুদ্ধে, তাই কেউ যদি আঘাত পেয়ে থাকেন আমি আন্তরিক ভাবেই দুঃখিত। অধমের ধৃষ্টটা মার্জনীয়)