Tuesday, 16 May 2017

স্মরণে শ্রী উল্লাসকর দত্ত (আজ তাঁর প্রয়াণ দিবস)


স্মরণে শ্রী উল্লাসকর দত্ত (আজ তাঁর প্রয়াণ দিবস)

১৯০৮ সালের ১লা মে, ওয়ার্নি স্টেশন থেকে গ্রেফতার করা হয় ক্ষুদিরাম বসুকে। ভীত ব্রিটিশ প্রশাসন সমগ্র পুলিশ বাহিনীকে নির্দেশ দেয় ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল চাকীর সাথে জড়িত সকলকে গ্রেফতার করার জন্য। ২ মে কলকাতার ব্রিটিশ প্রশাসনের পুলিশ আটটি স্থানে খানা-তল্লাশি চালায়। কলকাতার মুরারিপুকুরের বাগানবাড়ি থেকে বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, উপেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, উল্লাসকর দত্ত ও নলিনীকান্ত গুপ্তসহ ১৪ জন বিপ্লবীকে পুলিশ গ্রেফতার করে। ৪৮নং গ্রে স্ট্রিট থেকে অরবিন্দ ঘোষ সহ তিনজন বিপ্লবীকে, ১৩৪নং হ্যারিসন রোড থেকে ৫ জন বিপ্লবীকে, রাজা নবকৃষ্ণ স্ট্রিট থেকে হেমচন্দ্র কানুনগোকে (হেম দাশ), গোপীমোহন দত্ত লেন থেকে কানাইলাল দত্তসহ দুইজন বিপ্লবীকে পুলিশ গ্রেফতার করে। এছাড়া ১৩৪নং হ্যারিসন রোডের বাড়ি থেকে পুলিশ প্রচুর পরিমাণে বোমা তৈরির মাল-মশলা ও সাজসরঞ্জাম উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। পুলিশ ৩২নং মুরারিপুকুরের বাগানবাড়ি থেকে মাটির তলায় পোঁতা কয়েকটি ট্রাঙ্ক উদ্ধার করে। এই সব ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হয় বোমা ষড়যন্ত্র ও রাজদ্রোহের অভিযোগে মামলা। এই মামলাটিরই নামকরণ হয়েছিল 'আলিপুর বোমা ষড়যন্ত্র মামলা'। আলিপুর জজ আদালতে জেলা ও দায়রা জজ মি. চার্লস পোর্টেন বিচক্রফট এর আদালতে 'আলিপুর বোমা মামলা'র সূচনা হয়েছিল ১৯০৮ সালের ১৯ অক্টোবর। মামলায় অরবিন্দ ঘোষের উপর রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হয়। এই মামলায় একমাত্র চিত্তরঞ্জন দাশ বিনা টাকায় লড়েন, আসামীদের বিরুদ্ধে এই মামলা চলে ১২৬ দিন, দু'শর বেশি সাক্ষীকে জেরা করা হয়। ৪০০০ কাগজপত্র এবং ৫০০ জিনিসপত্র প্রমাণ হিসেবে হাজির করা হয়। চিত্তরঞ্জন দাশ তাঁর সওয়াল জওয়াবের সমাপ্তি বক্তব্য দেন ৯ দিন ধরে। আলীপুর মামলার শুনানী শেষ হয় ১৯০৯ সালের ১৩ এপ্রিল এবং মামলার রায় ঘোষণা হয় ৬ মে। মামলার রায়ে ৩৬ জন আসামীর মধ্যে বিপ্লবী বারীন্দ্র কুমার ঘোষ এবং বিপ্লবী উল্লাসকর দত্তের ফাঁসির আদেশ দেয়া হয় (পরে অবশ্য যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর দেওয়া হয়)। অন্য ১৭ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে দ্বীপান্তর ও কারাদণ্ড প্রদান করা হয়।

আজ সেই মহান বিপ্লবী শ্রী উল্লাসকর দত্তের প্রয়াণ দিবস, আসুন না কর্মব্যাস্ত জীবনের মাঝে একটু জেনে নিই সেসব অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের কথা। না বিপ্লব করতে বলছি না, ম্যাদামরা, পলায়নপর, মেকী বাঙালীর রক্তে সেই তেজ আর কোথায়? তবু স্মরণ করতে, জানতে দোষ কোথায়?

উল্লাসকর দত্ত এর জন্মতারিখ ১৬ই এপ্রিল ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দ, তিনি জন্মেছিলেন তৎকালীন ত্রিপুরা জেলার (বর্তমানে জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বাংলাদেশ) কালীকচ্ছ গ্রামের বিখ্যাত দত্তরায় বংশের এক ব্রাহ্ম পরিবারে। বাবা স্বনামখ্যাত অধ্যক্ষ দ্বিজদাস দত্ত (১৮৫৪-১৯৩৫) আর মা মুক্তকেশী। মা মুক্তকেশী ছিলেন কালীকচ্ছ গ্রামের আরেক বিখ্যাত নন্দীরায় বংশের মেয়ে। উল্লাসকর ছিলেন মা-বাবার দ্বিতীয় সন্তান। দাদা মোহিনীমোহন এর জন্ম ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দে। ছোটভাই সুখসাগর এর জন্ম ১৮৯০-এ। সুখসাগর-এর পর লাবণ্যকেশী নামে তাদের একজন বোন ছিলেন।

ছোটবেলায় উল্লাসকর এর ডাকনাম ছিল পালু, তবে তিনি কোনভাবেই অভিরাম নন। অনেকে তার নাম অভিরাম বলে প্রচার করতে চান। বিপ্লবী ক্ষুদিরাম (১৮৮৯-১৯০৮) এর ফাঁসি হয়ে যাওয়ার পর তাকে নিয়ে যে গান রচিত হয় (রচয়িতা বাঁকুড়ার বাউলকবি পীতাম্বর দাস। লোককবি ছন্দ মিলাতে গিয়ে ক্ষুদিরামের সাথে অভিরাম নামটি জুড়ে দেন) তাতে আছে – “হলো অভিরামের দ্বীপচালন মা, ক্ষুদিরামের ফাঁসি, একবার বিদায় দে মা..”। যেহেতু উল্লাসকরেরও যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর  হয়েছিল তাই অভিরাম এর জায়গায় অনেকেই উল্লাসকরকে বসিয়ে দেন। যাক সে কথা ভ্রমে ভরা, আর কর্তাভজা ইতিহাস আমাদের, নইলে সঠিক ইতিহাস চর্চা হলে বোধহয় আমরা অন্যরকম হতাম। 

যাইহোক বিগত সেই স্বর্ণ যুগে ভারতীয় উপমহাদেশে শিক্ষা, সংস্কৃতি, ধর্মপ্রচার সর্বোপরি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে অনেক বাঙালী আলোকবর্তিকা হিসেবে পথ দেখিয়েছে, তাঁদের মধ্যে উল্লাসকর অন্যতম। বাঙালিদের মধ্যে এমনকি ভারতীয়দের মধ্যে তিনিই প্রথম, যিনি সফল বোমা তৈরি করেন। তার তৈরী বোমাটিই ক্ষুদিরাম-এর হাতে তুলে দেয়া হয় অত্যাচারী ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে হত্যা করার জন্য। এহেন জাত বিপ্লবী উল্লাসকরের শৈশব সবুজে আর পুকুরে-ঘেরা গ্রাম কালীকচ্ছে কাটলেও পরবর্তীকালে তিনি এন্ট্রান্স পাশ করেন কলকাতা থেকে ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে। এরপর বিজ্ঞানবিষয় নিয়ে কলকাতার বিখ্যাত প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। পিতা দ্বিজদাসও একই কলেজের কৃতীছাত্র ছিলেন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে অনার্সসহ এম.এ পাশ করেন। কিন্তু পুত্র উল্লাসকরের নেশা ছিল রসায়নশাস্ত্রে। যা পরবর্তীকালে বোমা তৈরিতে তার কৃতিত্ব বয়ে আনে। প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র থাকাকালীন উল্লাসকর স্বদেশী আন্দোলনের প্রতি আকৃষ্ট হন। কলকাতার বিভিন্ন হলে বিশিষ্ট বাগ্মী ও স্বদেশী নেতা বিপিনচন্দ্র পাল (১৮৫২-১৯৩২) ও রবীন্দ্রনাথ (১৮৬১-১৯৪১) এর বক্তৃতা শুনেন। স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগদানে তার মূল প্রেরণা বিপিনচন্দ্র পাল। যিনি তার পিতার বন্ধু এবং মামাত ভাইয়ের শ্বশুর ছিলেন। উল্লাসকর এর মামা মহেন্দ্র নন্দীর ছেলে বীরেন্দ্রচন্দ্র নন্দী বিপিন পালের বড় মেয়ে শোভনাকে বিয়ে করেন। বৈবাহিক আত্মীয়তাসূত্রে বিপিন পালের কলকাতার বাসায় উল্লাসকরের যাতায়াত ছিল। এই সময় তিনি বৌদি শুভনার ছোটবোন লীলা পালের প্রেমে পড়েন। পিতা দ্বিজদাস দত্ত তখন হাওড়ার শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের অধ্যাপক, সন্তানসন্ততি সহ ওখানকার সরকারি বাসভবনে থাকেন।

বিখ্যাত প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র হলেও পড়ালেখায় মন ছিল না উল্লাসের। তিনি ভাবেন পরাধীন দেশে জজ-ব্যারিস্টার হয়ে কী হবে? প্রায় সমবয়সী প্রেমিকা লীলাও বিজ্ঞানের ছাত্রী। লীলা চান তাঁর উল্লাস লেখাপড়া শিখে বড় চাকুরি করবেন। কিন্তু উল্লাস এফ.এ তে ডাহা ফেল করেন, আসলে মনে মনে সাদা চামড়ার অত্যাচার তিনি কিছুতেই সহ্য করতে পারছিলেন না। এর মধ্যে একদিন প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক মি. রাসেলকে প্রকাশ্যে জুতো দিয়ে পেটালেন।

ব্যস উল্লাসকরের কলকাতায় লেখাপড়ার পাট চুকল। চিন্তিত পিতা বন্ধু বিপিন পালের পরামর্শে ছেলেকে বোম্বে পাঠিয়ে দিলেন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার জন্য। ওখানকার ভিক্টোরিয়া জুবিলি টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট এ তাকে ভর্তি করে দেয়া হলো। কিন্তু স্বদেশী মন্ত্রে যে একবার দীক্ষা নিয়েছে তাঁর কি ওইসবে মন টেকে? কলকাতায় তাদের গোপন সশস্ত্র আড্ডার খবর তিনি ঠিকই বন্ধুদের চিঠিপত্র মারফত পেতে লাগলেন। বিপ্লবী ভ্রাতৃদ্বয় অরবিন্দ ও বারীন্দ্র ঘোষ দের বাগানবাড়িতে (মানিকতলা অঞ্চলের ৩২, মুরারিপুকুর রোড) তখন বোমা বানানোর তোড়জোড় চলছে। বোম্বাইয়ের লেখাপড়া আরবসাগরে জলাঞ্জলি দিয়ে উল্লাসকর আবার ভিড়ে গেলেন বিপ্লবী দলে। বিলেতি পোশাক ছেড়ে পরলেন দেশি ন হাতি ধূতি আর চাদর। শুরু করলেন একবেলা আহার আর যোগাভ্যাস, স্বেচ্ছায় বেছে নিলেন বিপ্লবীর কঠোর জীবন।

অপরদিকে পিতার কলেজের লাইব্রেরিতে রসায়ন বিষয়ক পড়াশুনার পাশাপাশি ব্যবহার করতে থাকলেন কলেজ-ল্যাবরেটরি। লক্ষ্য আর স্বপ্ন একটাই- বোমা বানানো। বহু চেষ্টার পর ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে উল্লাসকর ও হেমচন্দ্র দাস বোমা তৈরিতে সফল হন। ১৯০৮ এর ফেব্রুয়ারি মাসে বোমার কার্যকারিতা পরীক্ষার জন্য ৫ জন বিপ্লবী দেওঘর এর পাহাড়ে যান। পরীক্ষার সময় এত বিকট শব্দে বোমাটি বিস্ফোরিত হয় যে, এতে যিনি বোমাটি ছুঁড়েছিলেন সেই প্রফুল্ল চক্রবর্তী ঘটনাস্থলেই নিহত হন। গুরুতর আহত হন উল্লাসকর দত্ত, পরে গোপন চিকিৎসায় কলকাতায় তাকে সুস্থ করা হয়। পরের ইতিহাস অনেকেরই জানা। তবুও সংক্ষেপে বলছি - সফল বোমা পরীক্ষার প্রায় তিন মাস পর কুখ্যাত ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোডকে হত্যার জন্য বিহারের মজঃফরপুরে পাঠানো হয় ক্ষুদিরাম বসু আর প্রফুল্ল চাকীকে। তারা উল্লাসকর দত্তের তৈরি করা বোমা সঙ্গে নিয়ে যান। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সেই বোমা কিংসফোর্ডের গাড়ির বদলে অন্য ইংরেজের গাড়িতে পড়ে। পরের দিন ধরা পড়েন ক্ষুদিরাম, প্রফুল্ল চাকি ধরা পড়ার আগে নিজের রিভলবারের গুলিতে আত্মহত্যা করেন। ফাঁসি হয়ে যায় ক্ষুদিরামের (১১ই অগাস্ট ১৯০৮)। শুরু হয় ধরপাকড়। মুরারিপুকুর বাগানবাড়িতে বোমা তৈরির কারখানা আবিস্কৃত হয়। অরবিন্দ, বারীন্দ্র, উল্লাসকর সহ ধরা পড়েন প্রায় সবাই। উল্লাসকরের ছোটবেলার দুই বন্ধু ধরণী সেনগুপ্ত ও নগেন সেনগুপ্ত, তারা থাকতেন কলকাতার ১৩৪, হ্যারিসন রোডে, আদি বাড়ি কালীকচ্ছ। ওনারা ওখানে কবিরাজী ব্যবসা করতেন, ধরা পড়লেন তারাও। অপরাধ, তাদের ঘরে বোমা তৈরির সরঞ্জাম রেখেছিলেন উল্লাসকর। আরও ধরা পড়েন উল্লাসকরের চার বছরের ছোট মামাত ভাই (মহেন্দ্র নন্দীর ছেলে) অশোক নন্দী। 

১৯০৮এর ১৯শে অক্টোবর ২৪ পরগণার জেলা ও দায়রা জজ মি. চার্লস পোর্টেন বিচক্রফট এর আদালতে যে মামলা উঠে ইতিহাসে তা আলীপুর বোমা মামলা নামে খ্যাত হয়। মজার বিষয় হলো ঐতিহাসিক এই মামলার বিচারক মি. বিচক্রফট ও আসামি অরবিন্দ ঘোষ কেম্ব্রিজে সহপাঠী ছিলেন এবং এক সাথে আইসিএস পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হন। অরবিন্দ সরকারি চাকুরিতে যোগদান না করে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দেন। মামলায় উল্লাসকর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন। তবে নিজেকে বাঁচানোর জন্য নয়, নিরপরাধ প্রতিবেশী ধরণী ও নগেনকে বাচাঁনোর জন্য। ঐতিহাসিক আলীপুর বোমা মামলা র রায় বেরোয় ১৯০৯ এর ৬ই মে। ৩৬ জন আসামির মধ্যে বিপ্লবী উল্লাসকর দত্ত ও বারীন্দ্রকুমার ঘোষ এর ফাঁসির আদেশ হয়। হেমচন্দ্র দাস ও অশোক নন্দীসহ ১৭ জনের বিভিন্ন মেয়াদে দ্বীপান্তর ও কারাদণ্ড হয়। অপরদিকে ১৭ জন বেকসুর খালাস পান (এর মধ্যে কালীকচ্ছের ধরণী ও নগেন ছিলেন)। কারাগারে অসুস্থতা হেতু মৃত্যুবরণ করেন ২১ বছরের টগবগে তরুণ কালীকচ্ছের অশোক নন্দী, তারিখটা ছিল ৬ই অগাস্ট ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দ।

ফাঁসির আদেশ শোনার পর যে উল্লাসকর আদালতে দাঁড়িয়ে রবিঠাকুরের গান গেয়েছিলেন – “সার্থক জনম আমার জম্মেছি এই দেশে, সার্থক জনম মাগো তোমায় ভালোবেসে”। পরবর্তীকালে উল্লাসকর এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করতে অস্বীকৃতি জানান, তাঁর যুক্তি ছিল যে ইংরেজের আদালত মানি না সেই আদালতে কোন আপিল নয়। অবশেষে তার প্রিয় ঠাকুর মামা যাকে তিনি সবচে বেশি ভালোবাসতেন সেই মহেন্দ্র নন্দীর (শহীদ অশোক নন্দীর বাবা) অনুরোধে তিনি আপিলের কাগজে সই করেন। উচ্চ আদালতের রায়ে ফাঁসির আদেশ রদ করে উল্লাসকর ও বারীন্দ্রের যাবজ্জীবন দ্বীপান্তরাদেশ দেয়া হয় ১৯০৯ এর ২৩শে অগাস্ট।

শুরু হয় এক অন্যজীবন, আরও কষ্টের জীবন। কলকাতা থেকে প্রায় ছয়শ মাইল দূরে আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ। ওখানকার সেলুলার জেলে পাঠানো হলো উল্লাসসহ দ্বীপান্তরপ্রাপ্ত অন্যদের। দশ ফুট বাই আট ফুট সেলে রাখা হলো একেক জনকে। কারাগারে থাকাকালীন ছিল কয়েদিদের খাটুনির নানা ব্যবস্থা - নারকেলের ছোবড়া থেকে দড়ি পাকানো, ঘানি চালিয়ে তেল নিষ্কাশন, বই বাধাঁই, ঝাড়ু তৈরি ইত্যাদি। একটি কলুর বলদ সারাদিন ঘানি ঘুরিয়ে যেখানে আটসের তেল বের করতে পারে সেখানে বিপ্লবী বন্দিদের বের করতে হতো এক মণ তেল। আবার আস্ত নারকেল ঘানিতে দিয়ে তেল বের করতে হতো, না পারলে কঠিন শাস্তি পেতে হতো। আর খাবার হিসেবে সকালে জুটতো দু হাতা কঞ্জি (কঞ্জি মানে গরম জলে চালগুড়ো সেদ্ধ)। দুপুরে এক বাটি ভাত, দুটো রুটি, অড়হর ডাল আর মাঝেমধ্যে কচুপাতার তরকারি।

প্রতিবাদী উল্লাসকর এহেন অন্যায় মেনে নেন নি, যথারীতি তিনি এর বিরুদ্ধে জেলে আন্দোলন শুরু করলেন এই বলে যে কোন পরিশ্রমের কাজ করবেন না। ফলে শাস্তি- অন্যত্র বদলি। আন্দামানেরই অন্য জেলে, আরও কষ্টের জায়গায়, ফলস্বরূপ তাঁর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়লো। আলীপুর জেলে থাকাকালীন সময়ে তিনি অলীক স্বপ্ন দেখা বা হ্যালুসিনেশান নামক মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়। এখানে এসে এই রোগ আরও বাড়ে। খিঁচুনিও দেখা দেয়। তাকে পাঠানো হলো মাদ্রাজের মানসিক স্বাস্থ্য নিবাসে। ওখানে চিকিৎসা চললো প্রায় ছয় বছর। প্রায় ১২ বছর কারাগারে কাটানোর পর মুক্তি মিলল উল্লাসকরের। সালটা ১৯২০। ফিরে এলেন কলকাতায়। হ্যারিসন রোডে একটি ঘি-এর দোকান খুললেন। একাই চালান, লোকসান দিয়ে কিছুদিন পর চলে এলেন জন্মগ্রাম কালীকচ্ছে। এখানে তাকে প্রতি সপ্তাহে একদিন সরাইল থানায় হাজিরা দিতে হয়। যে কারণে কলকাতা বা দূরে কোথাও যেতে পারেন না, বাড়িতেই থাকেন। নিজের তৈরি নৌকোতে ভেসে বেড়ান নদীতে। জন্মশিল্পী উল্লাসকর বাঁশি আর দোতারা বাজান, লোকে তন্ময় হয়ে শুনে। গ্রামের ছেলেরা ছাড়াও দূরদূরান্ত থেকে লোকজন আসেন তার কারাজীবনের কাহিনী শুনতে। অনুরোধ আসে কারাজীবনের ঘটনা নিয়ে বই লেখার। লিখে ফেলেন “আমার কারাজীবন” শীর্ষক বই, পরবর্তীকালে তিনিই যার ইংরেজি অনুবাদ করেন ’Twelve years of prison life’। থানায় হাজিরা দেওয়া বাতিল হওয়ায় তিনি আবার কলকাতা গেলেন। জেলে থাকাকালীন লীলার চিঠি পেতেন, অনেকদিন হয়ে গেছে লীলা লন্ডন চলে গেছেন, বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেওয়ার পর লীলা লন্ডনে কৃষিবিদ্যা নিয়ে পড়ালেখা করেন। দেশে ফিরে মিরাট, লাহোরে চাকুরি করার পর এখন বোম্বেতে উচ্চপদস্থ সরকারি চাকুরি করছেন। ছোটভাই সুখসাগর এর চিঠি থেকে এসব জেনেছেন উল্লাস। আবার ভাই সুখসাগরের চিঠি থেকেই জানলেন, লীলার বিয়ে হয়ে গেছে। স্তব্দ হয়ে গেলেন, মন থেকে তিনি এ বিয়ে কিছুতেই মেনে নিলেন না। 

এরপর বোম্বেতে লীলার সাথে দেখা করতে গেলেন, লীলার সামনে আগুন দিয়ে তার সব চিঠি পুড়িয়ে ধূতির খুঁটে ছাই বেঁধে আবার ফিরলেন কালীকচ্ছে। একাকী নিঃসঙ্গ উল্লাসকর, বাবা-মা কুমিল্লায়। দাদা মোহিনীমোহন কলকাতায়। ছোট ভাই সুখসাগর আর ছোটবোন লাবণ্যকেশী ওরফে পুঁটুরানী তিনি জেলে থাকাকালীন মারা গেছে। উল্লাসের সঙ্গী এখন দোতারা, বাঁশি আর ভিরমি খাওয়া (যে রোগে প্রচন্ড ব্যথায় তিনি অজ্ঞান হয়ে যান এবং মুখ দিয়ে ফেনা বের হয়)।

আবার একটি চিঠি মনে পড়াল প্রেয়সী লীলাকে, তাঁর লীলা বিধবা হয়েছে। আর কালীকচ্ছে মন টিকল না, আবার এলেন কলকাতা, ইতিমধ্যে দেশভাগ হয়েছে।  অথচও আজন্ম বিপ্লবী তিনি, স্বভাবতই দেশভাগ তথা বাংলাভাগ মেনে নিলেন না, সেই সময়ে পশ্চিমবাংলায় শরণার্থীর স্রোত তাকে ভীষণ কষ্ট দিল। তিনি ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রদত্ত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ভাতা প্রত্যাখ্যান করলেন।
ইতিমধ্যে উল্লাসকরের জীবনে ঘটে গেছে আর এক বিরাট ঘটনা, পক্ষাঘাতগ্রস্থ বিধবা লীলাকে ব্রাহ্মমতে বিয়ে করলেন তিনি, মর্যাদা দিলেন স্ত্রীর, স্বীকৃতি পেল তাঁদের ভালোবাসা। তখন তাঁদের বয়স ছেষট্টি প্রায়, চালচুলোহীন অসুস্থ দুজনের তখন আর কোলকাতায় থাকার কোন সংস্থান নেই। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের কোন একসমযে তাঁরা পাড়ি জমালেন আসামের শিলচর এ। ওখানে তাঁরা ছিলেন প্রেমাঞ্জন (লীলার বৈমাত্রেয় ভাই) এর মেয়ে কল্যাণীর কাছে, শিলচরে চলে যাবার পর উল্লাসকর জীবিত ছিলেন আরও তের-চৌদ্দ বছর। থেকেছেন শিলচরের বিভিন্ন জায়গায়। প্রথমে পদ্মনগরে। পরে নাজিরপট্টির পপুলার হোটেলে, তারাপুরে, জেল রোডে। তাদের ঐসময়ের জীবনযাপনের কাহিনী আজও আমাদের অজানা, আসলে দেশ স্বাধীন হওয়ার আনন্দে তদানীন্তন নেতৃবর্গ ভুলেই গেছেন এহেন অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের, উল্লাসকর তাঁর অন্যথা হবেন কেন? পরবর্তীকালে সহধর্মিণী লীলা পাল ইহলীলা সংবরণ করেন ১৯৬২তে। শিলচরে থাকাকালীন কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য সরকারের কোন আর্থিক সাহায্য বা পুনর্বাসন ব্যবস্থা উল্লাসকর বারবার প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেছেন - “I don’t want any help from any government”, কাঙিক্ষত স্বাধীনতা না পাওয়ায় বার বার তিনি আক্ষেপ করেছেন, স্বাধীনতার নামে দেশভাগ তার কাম্য ছিল না। দেশভাগের জন্য যারা দায়ী তাদের তিনি দেশদ্রোহী মনে করতেন। শিলচরে ১৭ই মে ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে ৮০ বছর বয়সে ভারতমাতার এই দামাল ছেলেটির জীবনাবসান হয়। উল্লাসকর দত্তের নামে শিলচরে একটি রাস্তার নাম থাকলেও আমাদের কল্লোলিনী কলকাতায় তাঁর নামে কোনও রাস্তা বা স্মারক নেই। বাঙালী হিসাবে যা সত্যিই আমাদের গর্বের বিষয়? সদা জাগুরুক বাঙালী বুদ্ধিজীবী সমাজ এই বিষয়ে একবার ভেবে দেখবেন কি?


তথ্য সুত্র – বিভিন্ন্য পত্র পত্রিকা, সর্বোপরি গুগুল।

Thursday, 11 May 2017

বুরহান ওয়ানির মৃত্যুতে যদি কাশ্মীর উত্তাল হতে পারে, তাহলে উমর ফায়াজে’র মৃত্যুতে নয় কেন?



বুরহান ওয়ানির মৃত্যুতে যদি কাশ্মীর উত্তাল হতে পারে, তাহলে উমর ফায়াজে’র মৃত্যুতে নয় কেন?

এই প্রশ্নটা গত কয়েকদিন ধরে আমার মনকে কুরে কুরে খাচ্ছে, অথচও হিসাবটা মেলাতে পারছিনা। হ্যাঁ আমি জঙ্গিদের গুলিতে নিহত কাশ্মীরের তরুণ সেনা অফিসার উমর ফায়াজ পারি’র (২২) কথাই বলছি। গত ডিসেম্বর মাসেই সেনাবাহিনীতে যোগদান করেছিলেন দক্ষিণ কাশ্মীরের কুলগাম জেলার এই যুবক, সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর প্রথমবার ছুটিতে বাড়ি এসেছিলেন, আত্মীয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন বলে। অথচও সেই প্রথম ছুটিই হল তাঁর জীবনের শেষ ছুটি, বিয়ের অনুষ্ঠান পরিণত হল তাঁর শবযাত্রায়।

সংক্ষেপে একটু জেনে নি এই উমর ফায়াজ পারি’র কথা, দপড়াশোনা দক্ষিণ কাশ্মীরের নবোদয় বিদ্যালয়ে, তারপর পুণের ন্যাশনাল ডিফেন্স অ্যাকাডেমিতে(এনডিএ)। পড়াশোনায় যথেষ্ট মেধাবী তাঁর সাথে খেলাধুলোতেও দক্ষ ছিলেন উমর। অর্থাৎ একজন গুণী, সফল মানুষের সব গুণই ছিল তাঁর মধ্যে, সেনাবাহিনীতেও তিনি অল্প সময়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু বুরহান ওয়ানির মতো কোনও একজন আজাদির সিপাহীর বুলেটে শেষ হয়ে গেলো এই প্রতিভাময় কাশ্মিরির জীবন।

না এটা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, কারণ, সোপিয়ান, কুলগামের মতো এলাকায় অশিক্ষা, বেকারত্ব’র সংখ্যা অনেক বেশি। তারা বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়ছে, ভারত বিরোধী জেহাদে অংশগ্রহণ করছে, পাথর ছুড়ছে। বুরহান ওয়ানি তাদের কাছে ‘হিরো’, আজাদির সিপাহী। আর সেখানে উমর ফায়াজরা ব্যাতিক্রমি হলেও দেশদ্রোহী ছাড়া আর কিছুই নয়। হয়তো সেখানকার প্রত্যেক বাবা-মায়েরাই চান তাদের সন্তান উমরের মতো সফল হোক, কোন বাবা মা আর চাইবেন তাঁদের সন্তান বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যকলাপে অংশগ্রহণ করে সেনাবাহিনী বা পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারাক, এই ব্যাপারে যতই তাদের মনে ভারত সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থাকুক না কেন, আমি নিশ্চিত তাঁরা তাঁদের সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কোথাই চিন্তা করে থাকবেন। আর এই বিষয়টা তথাকথিত আজাদির সিপাহীরা বেশ ভাল করেই জানত। তাই তারা উমর ফায়াজকে খুন করে ওই এলাকার মানুষকে বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল- ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার ফল কি হতে পারে।

হতে পারে সাময়িক জয় এই বিচ্ছিনতাবাদিদের হল, কিন্তু এটা তো ঠিক আজ কাশ্মীরের মানুষ প্রকৃত উন্নয়ন চায়, শিক্ষা চায়, কর্মসংস্থান চায়। এবার সমস্যা হল যারা কাশ্মীরকে অশান্ত করে রাখতে চায় তারা দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে যাতে এলাকায় কোনও রকমের উন্নয়ন না হয়, প্রতিনিয়ত অশান্তি্‌হিংসার বীজ বপন করে চলেছে, ক্রমাগত সাধারণ মানুষের মনে বিষ ঢেলে চলেছে। এমন পরিস্থিতি তৈরি করছে যাতে নিরাপত্তা বাহিনী, সরকারি কর্মীদের প্রতি সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম ঘৃণা তৈরি হয়, তাঁরা আক্রমণ, আঘাত করে বসেন তাঁদের। আসলে তারা কাশ্মীরীদের মেকি ভাবাবেগের কথা, ঝুটা আজাদির কথা বলে নাপাক পাকিস্থানের মদতে জেহাদের আগুন জ্বালিয়ে চলেছে। দুরভাগ্যের কথা দেশের কিছু আস্তিনের সাপ, মিডিয়া তথা বুদ্ধিজীবী মহল এতে মদত জুগিয়ে চলেছে। 

এখন এটাই এখন দেখার আগামী দিনে ভূস্বর্গ উমর ফায়াজের মৃত্যু নিয়ে সরব হয় কিনা? ঠিক যেমনটা আমরা লক্ষ্য করেছিলাম কাশ্মীরের ‘গ্ল্যামার বয়’ সন্ত্রাসবাদী বুরহান ওয়ানির মৃত্যুর পর হয়েছিলো। আজ যদি ভারতীয় সেনার কাছে বুরহান ওয়ানি যদি আত্মসমর্পন করত, তাহলে তার স্বযত্নে নির্মিত ভাবমূর্তি ধাক্কা খেত বা তাকে নিয়ে যে রোমান্টিক জীবনযুদ্ধের কাহিনী তৈরি হয়েছে তার বদলে হয়ত তাকে দু’তরফের দালাল বলে বিতর্ক শুরু হত। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য সেরকম কিছু না হওয়ায় কাশ্মীরের কট্টরপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদীরা এবং অল পার্টি হুরিয়ত কনফারেন্সের সহযোদ্ধারা আর একটি সুযোগ পেয়ে গেলো। এই বেশ কিছু দিন ধরে আমরা দেখেছি বুরহান ওয়ানিকে একজন রাজনৈতিক নেতা তথা মহান বিপ্লবীর আদর্শ হিসেবে তুলে ধরার মতলবি প্রচেষ্টা করে চলেছে কিছু বিক্রীত ভারতীয় সংবাদমাধ্যম। ফলস্বরূপ প্রায় শান্ত হয়ে আসা কাশ্মীর উপত্যকা ফের রূপান্তরিত হল কান্নার উপত্যকায়, পুলিশ, সেনাবাহিনীর পাল্টা প্রতিরোধে, গুলিতে কতজন বিক্ষোভকারী প্রাণ হারালেন? এর দায় কি গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী বিক্রীত এবং বিকৃত সংবাদমাধ্যমের উপর চাপালে খুব অন্যায় হবে? যারা মিথ্যা ‘আজাদি’র ধুয়ো তুলে তলে তলে পাকিস্থানের সাথে যুক্ত হবার স্বপ্ন দেখার জন্যে, নিজেদের ব্যাবসায়িক আখের গোছানর স্বার্থে বলি দিয়েছিল আম কাশ্মীরী জনগণকে। 

এখন এটাই দেখার আগামী দিনে এই মেকি সংবাদমাধ্যম উমর ফায়াজের মৃত্যু নিয়ে কতটা সরব হয়, দেশের সম্মানীয় ‘বুদ্ধিজীবী’ মহল, উমর খালিদ-কানাইয়া কুমারের মতো মহান বিপ্লবীরা কোনও প্রতিবাদ সভা করেন কি না। আর যদি না করেন তাহলে তাঁদের পাকিস্থানের পা চাঁটা কুত্তা বললে কি খুব ভুল হবে?

Tuesday, 25 April 2017

সুকনায় মাওবাদী হামলা আর কিছু প্রশ্ন?



সুকনায় মাওবাদী হামলা আর কিছু প্রশ্ন?

সোমবার দুপুরের এই  বৈপ্লবিক (?)( নাকি কাপুরুষের মতো পিছন থেকে ছুরিকাঘাত, এটা আমার বিপ্লবী বন্ধুরাই বলতে পারবেন) হামলায় মৃত্যু হয়েছে অন্তত ২৫ সিআরপিএফ জওয়ানের, কিন্তু আজ অবধি ফেসবুকে একজন মানবতাবাদী, সেকুলারবাদি বুদ্ধিজীবীকেও সমবেদনা জানাতে দেখলাম না। কারণ অবশ্য সহজেই অনুমেয়, আরে ওরা সব ডিউটি করতে গিয়ে মারা গেছে ওদের জন্যে চোখের জল ফেলার থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে - সাম্প্রদায়িক শক্তিকে আটকানো, হিন্দুত্বের ধজ্জিয়া ওড়ানো প্রমুখ। আর যারা মারা গেছে তাঁরা সব মিডিওকার ছেলেপুলে, আমাদের মতন বুদ্ধিজীবী নাকি এইসব হোয়াইট কালার প্রফেশনাল কি? বাব্বা মার্কেটে কল্কে পাই নি তাই গেছে সৈনিক হতে, আর এসব কাজে একটু লাইফ রিস্ক থেকেই যায়।

ঠিকই তো সৈনিক হওয়া কি এমন ব্যাপার? তাঁর থেকে আমাদের মতো বুদ্ধিজীবী, সেকুলারবাদি, মানবতাবাদী হওয়াটা কি চাট্টিখানি ব্যাপার?

গ্রামের কোন ছেলে যখন সৈনিক হবার স্বপ্ন দেখে তো ওর সকাল হয় চারটায়, উঠেই গ্রামের রাস্তায় দৌড়তে থাকে, কতই বা বয়স হয় এই ষোলো কি সতেরো বছর। মুখে  তখনও কৈশোরের নিস্পাপ ভাব, লালিত্য থেকে যায় আর ঘাড়ে থাকে সংসারের গুরুভার। কোনক্রমে মাধ্যমিক/ উচ্চ মাধ্যমিক পাশ আর সৈনিক হওয়ার জন্যে দিন রাত এক করে দেয়। এই স্বপ্নের ভাগীদার ছেলেটি একা নয় একচিলতে ঘরে বসে থাকা যুবতী বোন/ দিদি, বয়স্কা মা আর সময়ের ভারে, গরিবির সাথে যুজতে যুজতে দুর্বল ক্ষয়াটে হয়ে যাওয়া বাবাও। সবাই মিলে স্বপ্ন দেখে বাড়ীর ছেলেটা যদি কোনক্রমে সিআরপিএফ, আর্মি বা সেনাবাহিনীর যেকোনো একটি শাখায় একটি চাকরি জোটাতে পারে (থুড়ি আপানাদের মতে সরকারী চাকরি, মানে ছেলেটি আপন জব সিকুইরিটির স্বার্থে জুটিয়ে নিয়েছে তাই) তাহলে সংসারের হাল একটু ফিরবে, ভালো জায়গায় বিয়ে হবে যুবতী বোন বা দিদিটির, ভাইটিও পড়াশুনা শেষে দাদার মতো সৈনিকের জীবন বেঁছে নিতে পারবে, বাড়ীতে অসুস্থ মা-এর চিকিৎসা হবে, বুড়ো বাবা একটু বিশ্রাম নিতে পারবে, কিংবা মহাজনের কাছে বাঁধা পড়া জমিটি ছাড়িয়ে নিয়ে চাষাবাদ করতে পারবে, এরকমই কত আটপৌরে স্বপ্ন দেখে তাঁরা। আর এঁরা যখন যোগ দেয় সশস্ত্র বাহিনীতে, মনের কোনায় এই স্বপ্নটিয়ও থাকে যে সে দেশের সেবায় লাগছে, দেশকে রক্ষার মহান দায়িত্ব নিয়েছে। তাই বোধহয় প্রাণঘাতী হামলার সময়েও যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার কথা ভাবে না অকাতরে নিজের প্রান বলিদান করে যায়। এঁদের মৃত্যুকেই তো ছোট করা যায় তাই না?

যারা ২৪ ঘণ্টা মৃত্যুর ছায়ায় বাস করে, জলে জঙ্গলে তাঁবুর ভিতরে আধপোড়া রুটি, একটু ডাল, সবজি খেয়ে নিজের কর্তব্য পালন করে চলে, যাঁদের মাইনে থেকে সরকার ইনকাম ট্যাক্স কেটে নেয় (অথচও মাননীয় সাংসদদের ইনকাম ট্যাক্স ফ্রি), বাড়ী থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে বসে থাকা জওয়ান ভাইটির ফোনের জন্যে কত হ্যাপা পোহাতে হয়, অনেক সময় অসুস্থ মায়ের খবর, সন্তানসম্ভবা স্ত্রীর খবর কিংবা অসুস্থ সন্তানের খবরও নিতে পারে না মাসের পর মাস, অথচও আমরা নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে বসে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিপ্লবের ঝড় তুলে দিই, ফোন/ মেসেঞ্জারে আপনজনের সাথে কানেক্ট করে থাকি তাঁরাই এঁদের ভুলে যাই কিভাবে?

না ভুলি না এঁদের নিয়ে রাজনীতি করতে ভুলি না, অথচও দেশকে জয় এনে দেওয়া খেলোয়াড়দের জন্যে এক কোটি টাকা পুরষ্কার দাবি করতে পারি (না আমি কোনও খেলোয়াড়কে ছোট করছি না) অথচও কোনও সৈনিক শহীদ হলে তাঁদের পরিবারের ভরণপোষণের জন্যে আওয়াজ ওঠাতে পারি না। অথচও জাতপাতের নামে সংরক্ষণ ব্যাবস্থার সুযোগ নিতে পারি।  

ঠিকই, দেশে কত পরিবর্তন হয়েছে, অচ্ছে দিন আসছে শুনতে পাই, দেখতে পাই না। আর হবে নাই বা কেন? আমাদের দেশে সততার প্রতীক মুখ্যমন্ত্রী আছে, চাওয়ালা প্রধানমন্ত্রী আছে, চপ্পলবাজ নেতা/ নেত্রী আছে, দুর্নীতিতে ডুবে থেকেও আমাদের নেতা/ নেত্রীরা সন্মানের সাথে ঘুরে বেড়াতে পারে সেই দেশে এরকমটাই সম্ভব।

Friday, 14 April 2017

পয়লা বৈশাখ, বাঙালী আর কিছু ঢপের কিসসা!


পয়লা বৈশাখ, বাঙালী আর কিছু ঢপের কিসসা!

আজ পয়লা বৈশাখ, সংস্কৃতিমনস্ক বাঙালীর বড় আদরের দিন, অন্যান্য দিন ডমিনজ, পিজ্জা হাট ইত্যাদি জায়গায় বিচরিত বাঙালী (সাথে অদ্ভুত বাংরেজি বুলি, সাহেবি আদবকায়দা সহ) আজ মাটির টানে (?) ধুতি, পাঞ্জাবীতে ফুল বাবুটি সেজে সিক্সথ বালিগঞ্জ প্লেস বা ভজহরি মান্নায় ঢুঁ মারবে, সাথে ইলিশের বড় পেটির কাঁটা (সাথে আরও কতকিছু) চিবুতে চিবুতে দেশ/ বিদেশ, কালচার কতকিছু নিয়ে লম্বা লেকচার ঝাড়বে। শেষে টিস্যু পেপারে হাত মুছে, বাহারি পান চেবাতে চেবাতে ‘শুভ রাত্রি’ বলে ঘুমাতে চলে যাবে। না এই পর্যন্ত গল্পটি ঠিকঠাকই আছে, বরং এর অন্যথা হলেই মনে প্রশ্ন জাগাটা স্বাভাবিক।

তবু বেয়াদব মনে প্রশ্ন জাগে আচ্ছা প্রতিবেশী দেশে কেমন আছে কুলভূষণ যাদব? জাস্ট ফাঁসির জন্যে অপেক্ষা করেছেন না ইতিমধ্যে ঝুলে পড়েছেন কে জানে? তাঁর কথা কি ভুলে গেছি আমরা? আসুন একটু ফ্ল্যাশব্যাকে যাওয়া যাক, আশা করি ইতিহাসের এই ছোট্ট সফর খারাপ লাগবে না নববর্ষের এই শুভ দিনে।

২০০১ সাল, ভারতীয় পার্লামেন্টে হামলা, ৯ জন মৃত, যার মধ্যে একজন মালি, ১৯ জন আহত। ঘটনার তদন্তে পাওয়া গেলো, এই সুন্দর ঘটনার মাষ্টার মাইন্ড শ্রীযুক্ত আফজল গুরু।৯ই, ফেব্রুয়ারি, ২০১৩, ঘটনার তেরো বছর বাদে জামাই আদরে রাখার পর বারে বারে বিচার করে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় আফজল গুরুকে ফাঁসি দেয় ভারত সরকার। তখন আমাদের মানবতাবাদী মানবাধিকার সংগঠন, রাজনৈতিক দল মায় ছাত্র সংগঠন গুলি অবধি (APDR, JKLM) এই ফাঁসির মানে পরিকল্পিত হত্যার বিরোধিতা করে। পরবর্তীকালে অর্থাৎ ২০১৫ তে JNU থেকে স্লোগান ওঠে - "আফজল হম সরমিন্দা হ্যায়, তেরা কাতিল জিন্দা হ্যায়", আমাদের সাধের পশ্চিমবঙ্গও পিছিয়ে থাকেনি এই প্রতিবাদ/ বিক্ষোভ কর্মসূচী থেকে, JU থেকে স্লোগান ওঠে - "আফজল বোলে আজাদী", “কাশ্মীর মাঙ্গে আজাদি”।

আর একটু আগে যাওয়া যাক, ১৯৯৩ মুম্বাই বিস্ফোরণ, ৫ই অগাস্ট, ১৯৯৪ এবারেও একজন কুচক্রী ধরা পড়ল, নাম ইয়াকুব মেমন। সুদীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার পরে, ৩০শে জুলাই, ২০১৫ লটকে দেওয়া হল ফাঁসিতে, যথারীতি নিউজ পেপার, সদা জাগুরুক বুদ্ধিজীবী, মানবতাবাদীর দল কেঁদে ভাসিয়ে দিলেন। 
হাল ছেড়ো বন্ধু তুমি আরও আছে, বুরহান ওয়ানি আপনার আমার প্রিয় কাশ্মীরের ভুমিপুত্র, বেচারি আম কাশ্মিরির দুঃখ দুর্দশা সহ্য করতে না পেরে হাতে বন্দুক তুলে নিয়েছিল কাশ্মীরের স্বাধীনতার জন্যে, কাশ্মীর কে ভারতীয় সেনার থেকে অত্যাচারমুক্ত করার জন্যে। কতবার না জানি তার ak47 এর সামনে লুটিয়ে পড়েছে কত অত্যাচারী সেনার দম্ভ, বুরহানের স্বাধীন বুলেট ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে কত সেনার অত্যাচারী বুক। এরকম সোনার টুকরো ছেলে একদিন ভারতীয় সেনার সাথে লড়াই লড়াই খেলতে গিয়ে শহীদ হল, কবীর সুমন গান বাঁধলেন,  চারিদিকে ধিক্কার/ হাহাকার উঠে গেলো।

মিডিয়া সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল, বিশ্ববিদ্যালয় গুলিতে প্রদীপ জ্বলে উঠলো, কত জ্বালাময়ী ভাষণ দেওয়া হল অত্যাচারী ভারত সরকারের প্রতি। মনের ভিতর থেকে বিবেক বলে উঠলো “ সাবাস, এই তো চাই, এই তো চাই”।

সত্যি এতো উদারমনস্ক, মুক্ত চিন্তার ব্যাপ্তি, মানুষের জন্য এতো ভালোবাসা অন্য কোথাও পাবেন? এই জন্যেই আমরা বুক ঠুকে বলতে পারি - " এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবেনাকো তুমি। সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি"। যারা আমার দেশের মানুষের প্রান নিয়েছে, তাঁদের প্রতি এই ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিভঙ্গি ভারতের মতো অসহিষ্ণু দেশেই সম্ভব।

এবার সাম্প্রতিক ঘটনায় আসি, ৩রা মার্চ ২০১৬, ইরান থেকে অপহরণ করা হল কুলভূষণ যাদবকে, চরবৃত্তির অভিযোগে (যদিও প্রমানিত নয় এখনও), একটু দেখে নেওয়া যাক তিনি কি কি করেছিলেন?

১) পাকিস্তান পার্লামেন্টে হামলা করেছিলো? – না। 
২) আজমল কাসভের মত অস্ত্র নিয়ে করাচী/ লাহোরে হামলা করেছিলো, আর অনেক নিরীহ পাকিস্থানি নাগরিক মারা গিয়েছিলো? – না। 
৩) বুরহান ওয়ানির মতো পাকিস্থানি সেনাদের হত্যা করেছিলো? – না। 

তাহলে তাহলে? না না এইসব অবান্তর প্রশ্ন করা যাবে না? কুলভূষণ যাদব ভারতীয় তদুপরি RAW এর এজেন্ট (পাকিস্তানের দাবী অনুযায়ী), তাই ১০ই এপ্রিল ২০১৭, পাকিস্থানি সেনা আদালত তাঁকে  মৃত্যুদন্ড দিতেই পারে। আর কে জানে এতদিনে তা কার্যকর হয়ে গেছে কিনা? এর আগে সরবজিত, রবিন্দর কৌশিক এরকমই সুবিচারের ফল ভোগ করেছেন কিনা।

আজ কিন্তু APDR, JKLM, JNU, JU তে বড়ই অন্ধকার, কোনও মোমবাতি জ্বলছে না। কোনও বিক্ষোভ/ মিছিল, প্রতিবাদ সভা হচ্ছে না।

পশ্চিমি দুনিয়ায় ফেক নিউজ, পেড নিউজ এই কথাগুলি খুব শোনা যায়। কিন্তু একবার কি ভেবে দেখেছি আজকের ভারত এর ছোঁয়াচ থেকে বেঁচে তো? আমাদের দেশ, সরকার অসহিষ্ণু, সেনা অত্যাচারী যারা এসব বলেন সেইসব মানবতাবাদী, বুদ্ধিজীবী শিক্ষিত নাগরিকদের বলতে চাই, হ্যাঁ ভারত অসহিষ্ণু, নইলে আজমল কাসভকে হাতেনাতে অকুস্থলে ধরার পরও বছরের বছর জামাই আদর দিয়ে বিচার, আফজলকে ১৩ বছর সময় দেওয়া এসব ভারতের অসহিষ্ণুতারই প্রমান তাই না? আর ভেবে দেখুন না ভারত যদি না অসহিষ্ণু হতো, তাহলে তাঁরা নির্বিঘ্নে তাঁদের এই জাগরুক প্রতিবাদ কর্মসূচী কি চালিয়ে যেতে পারতেন? পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর দিকে চোখ রাখলে কি বলবেন তাঁরা? 

না আর কিছু বলতে বা ভাবতে ভালো লাগছে না, আর আমাদের বুদ্ধিজীবী, বিদ্বজ্জন কন্টকিত বাংলায় বসে এর থেকে বেশি কি বা চিন্তা করতে পারি? তবু অনুরোধ করব নববর্ষের হুল্লোড়ে আনন্দ, মজা করতে করতে যদি পারেন তাহলে একবার নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন রাখুন, ঠিক দিশায় যাচ্ছি তো আমরা? ব্যাস আর কিছু না হলেও চলবে।

(আমার এই লেখা কারও ভাবাবেগে/ স্বার্থে আঘাত দেওয়ার জন্যে নয়, অপিতু এই লেখা আমার মনোকষ্টের বহিঃপ্রকাশ মাত্র, তবু যদি কেউ আঘাত পেয়ে থাকেন, তা অনিচ্ছাকৃত ও এই ত্রুটি মার্জনীয়) 

Tuesday, 11 April 2017

পাকিস্থান আছে সেই পাকিস্থানেই



পাকিস্থান আছে সেই পাকিস্থানেই

গতকাল পাকিস্থানের সেনা আদালতে প্রাক্তন ভারতীয় নৌসেনা আধিকারিক কুলভূষণ যাদবকে চরবৃত্তির অভিযোগে সোমবার ফাঁসির সাজা শোনানো হয়েছে, যা ঘিরে আরও একবার উত্তাল ভারতীয় রাজনীতি তথা দেশ। 

পাকিস্থান আবার একবার প্রমান করে দিলো, তাঁরা পিছন থেকে ছুরি মারতেই অভ্যস্ত। ইতিহাস তথা এই ঘটনা সেটাই প্রমান করে। একটু অন্য প্রসঙ্গে আসি, পাক উপকূলরক্ষী বাহিনীর একটি নৌকা তাদের জলসীমায় মৎসজীবীদের নৌকায় তল্লাশি চালাচ্ছিল। কিন্তু প্রবল ঢেউয়ের কবলে পড়ে তাঁরা ভারতীয় জলসীমায় স্যার ক্রিক এলাকায় ঢুকে পরে। তারপরই মাঝসমুদ্রে টাল সামলাতে না পেরে ৬ নাবিক-সহ  উল্টে যায় নৌকা। ওই দুর্ঘটনার খবর জানতে পেরে চিন সফরে থাকা পাকিস্তান মেরিটাইম সিকিউরিটি এজেন্সির প্রধান সাহায্য চেয়ে, দিল্লিতে ইন্ডিয়ান কোস্ট গার্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সে রাতেই বেশ কয়েকটি জাহাজ ও নৌকা-সহ সমুদ্রে তল্লাশি অভিযান শুরু করে উপকূলরক্ষী বাহিনী। এছাড়াও ওই এলাকায় থাকা থাকা সমস্ত জাহাজ ও নৌকাগুলিকে বেতার মারফত পাক নাবিকদের কথা জানিয়ে দেওয়া হয়। অতঃপর স্যার ক্রিক এলাকায় তন্নতন্ন করে খোঁজার সময় এক ভারতীয় মাছধরা নৌকা উল্টে যাওয়া পাক নৌকাটি দেখতে পায়। এছাড়াও দুই  ডুবন্ত পাক নাবিককে উদ্ধার করে তাঁরা। সঙ্গে-সঙ্গে খবর পাঠানো হয় আইসিজিএস সম্রাট নামের উপকূলরক্ষী বাহিনীর জাহাজে। তাঁদের ওষুধপত্র দিয়ে সুস্থ করে তোলা হয়। বাকি চার জন সমুদ্রে ডুবে ইতিমধ্যেই প্রাণ হারিয়েছিলেন। সেই চারজনের দেহও উদ্ধার করে তুলে দেওয়া হয় পাকিস্তানি জাহাজ পিএনএস আলমগিরের হাতে। ফিরিয়ে দেওয়া হয় প্রাণে বাঁচা দুই নাবিককেও। হয়তো অনেক ওয়েব নিউজ পোর্টাল বা খবরের কাগজে এই খবরটি পড়ে থাকবেন আপনারা। আচ্ছা কি মনে হয়? ন্যুনতম সৌজন্যবোধ, মানবিকতা লোপ পেয়েছে পাকিস্থান নামে বার্থ দেশটির? তাই তো মনে হয় নইলে প্রান বাঁচানোর প্রতিদান প্রান নিয়ে কিভাবে দেয় এঁরা?

ভালো বেশ ভালো, অন্ততও যারা কথায় কথায় মানবিকতার দোহাই পেড়ে ভারতীয় সেনার, এই দেশের মুণ্ডপাত করেন তাঁদের চক্ষু উন্মীলন হবে কি? মনে তো হয়না, আস্তিনের সাপ তার ধর্ম ত্যাগ করবে কি ভাবে? সময় আগত শত্রুপক্ষ যে ভাষায় বুঝতে আগ্রহী তাঁকে সেই ভাষায় প্রত্যুত্তর দেওয়ার। 

কিছুদিন আগে পাক কলাকুশলী দের ব্যান করার ব্যাপারে যে বুদ্ধিজীবী, শিল্পী সমাজ এত প্রতিবাদের ঝড় তুলেছিল তাঁরা সরবজিত, কুলভূষণ যাদবের বেলায় নিশ্ছুপ কেন? তবে কি............

Friday, 24 March 2017

ভাবের বাঙালি অথবা লোভী কাঙালির চুপকথা – পর্ব ২


ভাবের বাঙালি অথবা লোভী কাঙালির চুপকথা – পর্ব ২

হাঁস ছিল সজারু ব্যাকরণ মানিনা, হয়ে গেল "হাঁসজারু" কেমনে তা জানিনা। উঁহু এই হাঁসজারু জীবটির দেখা শুধু সুকুমার রায়ের কবিতায় মিলবে এমন ভুলেও ভাববেন না, চোখকান খোলা রাখিলে মদীয় শিক্ষিত ভদ্দরলোকেদের মাঝে থুড়ি এই বঙ্গ সমাজেও এদের যত্র তত্র দেখিতে পাইবেন। দেখিবেন ইহারা জনগনের মাঝে সমাজ শোধরানোর বুলি থুড়ি মানবতার ঝুলি হাতে জ্ঞ্যান বিতরনের জন্যে উপস্থিত হয়েছেন। এঁদের মধ্যে কেউ শ্রীযুক্ত কবি, কেউ কালো কোটধারি আইনের রক্ষক, কেউ বা শিক্ষক, শিক্ষিকা নামক মহান কুলোদ্ভবজাত, কেউ ইঞ্জিনিয়ার - ডাক্তার, মানে সব হোয়াইট কালার প্রফেশনাল, আর কেউবা নিতান্তই স্বতন্ত্র অর্থাৎ আঁতেল গোষ্ঠীভুক্ত। তবে এনাদের উদ্দেশ্য মহৎ অর্থাৎ হিন্দু ধর্মের মুণ্ডপাত। বেশ কিছুদিন আগে মুক্তমনা বলে একটি ওয়েবসাইটে কিছু লেখা দেখলাম স্বামীজি কে নিয়ে, মনে ঘৃণা হল এঁরা মুক্তমনা না হীনমনা? নইলে এইভাবে ঘৃণা, অবিশ্বাসের বিষ ছড়াতে পারতেন না। নিজেরা এই দেশ সমাজ কে কি দিতে পেরেছেন তাঁর বিশ্লেষণ না করে স্বামীজির মূল্যায়ন করতে বসেছেন!

স্বাধীন ভারতের নাগরিক হিসাবে এই “হাঁসজারু” দের মত প্রকাশের অধিকার অবশ্যই আছে, আমি এটাকে সন্মান জানাই। কিন্তু মনে খুব প্রশ্ন জাগে যে শ্রী যুক্ত বাবু/ বিবিদের প্রতি প্রতিবাদ যদি করতেই হয় তাহলে সব ক্ষেত্রে করেন না কেন? যখন দেগঙ্গা, কালিয়াচক, তেহত্ত বা ধুলাগরের মতো ঘটনাগুলি ঘটে তখন কি আপনাদের কলমগুলি কনডম পড়ে থাকে? যখন ভারতে, প্রতিবেশী রাষ্ট্রে হিন্দু নিগ্রহের ঘটনা ঘটে কোথায় থাকেন এঁরা আর এঁদের লেখনী? যদি প্রকৃত মানবতাবাদী হিসাবে নিজেদের তুলে ধরতে চান তাহলে সব ধর্মের উগ্রতা, গোঁড়ামি নিয়ে লিখুন নইলে শুদু হিন্দু ধর্মকে সফট টার্গেট করবেন না। কিন্তু জানি আপনারা পারবেন না, আপনাদের মস্তিস্ক, বিচার বিবেচনা সবই বিক্রিত এবং বিকৃত। ভারতের মতো বহু ধর্ম, বহু ভাষা, বহু সংস্কৃতি, বহু জাতি-উপজাতি-জনজাতির দেশে না হিন্দু মৌলবাদ কাম্য না ইসলামী মৌলবাদ কাম্য। তাই প্রতিবাদ করতে হলে সব ক্ষেত্রেই করা উচিত যাতে কোনও একটি পক্ষ তোষণের সুবিধা না পেয়ে বসে, কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে আমাদের তথাকথিত বুদ্ধিজীবী মহল ও রাজনীতির ব্যাপারীরা সেটাই করে চলেছেন দিনের পর দিন ধরে। 

এটা কি আমরা বুঝতে পারছি যে এই অনৈতিক তোষণের ফলে কেবল হাত শক্ত হবে হিন্দু, মুসলিম উভয় মৌলবাদীদের। অপরদিকে সবথকে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ শান্তিপ্রিয় হিন্দু-মুসলমানরা, যারা কোনভাবেই এই মৌলবাদীদের সমর্থন করেন না। একটু ভেবে দেখুন না আইএস, আল-কায়দা প্রভৃতি জঙ্গি সংগঠনগুলির সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডের জন্য সকল মুসলমানরা দায়ী নয়, তবু তো সারা বিশ্বই আজ তাদেরই সন্দেহের চোখে দেখছে! তাহলে এই পারস্পরিক সন্দেহের বাতাবরণে যেখানে সমাজের সব স্তরের বুদ্ধিজীবী, লেখক, শিল্পী ও কলাকুশলীদেরই প্রত্যেকটি ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ করা উচিত ছিলো সেখানে তাঁরা তা না করে শুধুমাত্র হিন্দু ধর্মকেই টার্গেট বানিয়ে নিলেন কিসের আশায়? 

আর রাজনৈতিক ছাতার তলায় মেকি ধর্মনিরপেক্ষতা বুলি আওড়ে যাতে নিজেদের ব্যক্তিগত আখের গুছিয়ে নেওয়া যায় এই আশায় তো? না কবিতার ঘায়ে ধর্ম মুচ্ছ যায় না, অত ঠুনকো নয় ধর্মের ভিত, কিন্তু হ্যাঁ এতে মৌলবাদীদের হাত শক্ত হয়, আর অবশ্যই নিজের আখের গুছিয়ে নেওয়া যায়। আর এই ছল চাতুরী কেউ ধরে ফেললেই তাঁর উপর তকমা লাগিয়ে দাও সাম্প্রদায়িক, তারপর বাকি কাজ তো সহযোগী মৌলবাদী, রাজনৈতিক নেতা/ নেত্রী, তাঁদের চ্যালা চামুণ্ডারাই করে দেবে। 

বাহরে বুদ্ধিজীবী সমাজ কি সুন্দর তোমাদের ধর্মনিরপেক্ষতার মাপকাঠি? আসলে মেকি বুদ্ধিজীবী মহল ধর্মনিরপেক্ষতা ভারতের শিকড়, অন্তরাত্মা থেকে আহরণ না করে পাশ্চাত্য দেশগুলি থেকে টুকে মেরে দিয়েছে তাই আজ আমরা উপহারে পেয়েছি আজকের এই তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতা।
আজকের ভারতে এই বুদ্ধিজীবী মহল দুর্যোধনের প্রকৃত উত্তরসূরি কারণ দুর্যোধন অন্ততও মুক্ত কণ্ঠে স্বীকার করেছিলেন "জানামি ধর্মম্ ন চ মে প্রবৃত্তি, জানামি অধর্মম্ ন চ মে নিবৃত্তি"। অর্থাৎ ধর্ম কি, তা আমি জানি। কিন্তু আমার তাতে প্রবৃত্তি নেই। আর অধর্ম কি, তাও আমি জানি কিন্তু তা থেকে নিজেকে নিবৃত্ত করার ক্ষমতা আমার নেই। আর এই বুদ্ধিজীবীরা তো সেটুকু স্বীকার করার মতো সৎসাহস দেখাতে পারছেন না।

তাহলে উপায়? মহান বিপ্লবী চে গুয়েভারার একটি উক্তি মনে পড়ে গেলো – “অন্যায় যখন নিয়ম হয়ে উঠে, তখন প্রতিরোধ কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়“। একটা গানের কথা খুব মনে পড়ে যাচ্ছে – “পথে এবার নামো সাথী পথেই হবে পথ চেনা, জনস্রোতে নানান মতে মনোরথের ঠিকানা, হবে চেনা, হবে জানা”। সমাজের সর্বস্তরে আজ এই মেকি ধর্মনিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ চাই, নইলে আগামী দিনে ক্ষতিগ্রস্ত আমরাই হবো, আর এই ধূর্ত বুদ্ধিজীবী মহল আর রাজনীতির কারবারিরা আখের গুছিয়ে বিদেশে গিয়ে ভারত দহনের দৃশ্য দেখে বেহালা বাজাবে। 

তাই আকুতি একটাই চিনে নিন এই ভণ্ড ধর্ম নিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবী দের ও তাঁদের প্রভু রাজনীতির ব্যাপারীদের, ভুলে যাবেন না কবি গুরু রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরের সেই কবিতার লাইন – অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা তারে যেন তৃণ সম দহে। অন্যাযের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের শিক্ষা আমাদের ভাগবত গীতাও দিয়ে গেছে (অবশ্য যদি ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবী মহল গীতাকে হিন্দুদের ধর্ম গ্রন্থ হিসাবে চিহ্নিত করেন তাহলে আলাদা কথা), তাহলে আমরা আজ বিস্মৃত কেন? 

কিন্তু আমি স্মরনাপন্ন আজ ভাগবত গীতার, কানে যেন বাজছে সেই অমোঘ শাশ্বত বরাভয় ধ্বনি - “यदा यदा हि धर्मस्य ग्लानिर्भवति भारत। अभ्युत्थानमधर्मस्य तदात्मानं सृजाम्यहम्॥ परित्राणाय साधूनां विनाशाय च दुष्कृताम्। धर्मसंस्थापनार्थाय सम्भवामि युगे युगे “॥ জয় হোক এই ভারতের, এই ভারতের সকল অধিবাসীগণের। শান্তি, সমৃদ্ধিতে ভরে উঠুক তাঁদের জীবন। উত্তরসূরিদের জন্যে থাকুক এক শক্তিশালী, সঙ্ঘবদ্ধ ভারত।  


(আমার এই লেখা কারও ভাবাবেগে/ স্বার্থে আঘাত দেওয়ার জন্যে নয়, অপিতু এই লেখা আমার মনোকষ্টের বহিঃপ্রকাশ মাত্র, তবু যদি কেউ আঘাত পেয়ে থাকেন, তা অনিচ্ছাকৃত ও এই ত্রুটি মার্জনীয়) 



Wednesday, 8 March 2017

আন্তর্জাতিক নারী দিবস প্রসঙ্গে


আন্তর্জাতিক নারী দিবস প্রসঙ্গে

আজ ৮ই মার্চ, আন্তর্জাতিক নারী দিবস। সকালবেলা পেপার খুলেই দেখি সরকার (পড়ুন রাজনৈতিক দল) কের দেওয়া পাতা জুড়ে কি বড় বিজ্ঞ্যাপন? তাঁর সাথে ঝুড়ি ঝুড়ি হিসাব নারী স্বার্থে কি কি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সাধু সাধু কি মহৎ প্রচেষ্টা সরকার তথা রাজনৈতিক দলগুলির, অথচও এই দলগুলিই কিভাবে নির্বাচনে নারী নিগ্রহকারী মহান ব্যাক্তিদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবার টিকিট প্রদান করে বুঝতে পারি না! ঠিক সেইভাবেই বুঝে উঠতে পারি না ভারতীয় সংসদের উভয় কক্ষ (লোকসভা, রাজ্যসভা)তে মহিলাদের যোগদান এত কম কেন? বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভা গুলির দিকে তাকালেও একই প্রমান পাওয়া যায়। তবে কি সবই মুখের কথা, লোক দেখানো আর মনভুলানো কথা মাত্র?

মানুষ হিসেবে একজন নারী তাঁর পরিপূর্ণ অধিকারের দাবিতে সুদীর্ঘকাল যে আন্দোলন চালিয়ে আসছে, সেই লড়াইয়ের সম্মানস্বরূপ পালিত হচ্ছে নাকি নারী দিবস। যাতে অন্তত একটা দিন আমরা সবাই, গোটা বিশ্ব আলাদা করে মনে করতে পারি নারীরাই এই জগতের শক্তির উত্‍স আর প্রেরণা। যদি ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাই তাহলে দেখতে পাব সামাজিক কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন ধারায় নারী কোনও অংশেই পুরুষের পিছনে ছিল না। ফ্রান্সের প্যারি কমিউন, ফরাসি বিপ্লব, যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক আন্দোলনসহ ভারত উপমহাদেশে ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে পুরুষের পাশেই নারীকে দেখা গেছে। কিন্তু, কাঙ্ক্ষিত দাবি/ সন্মান নারী্রা অর্জন করতে পারেনি।

আজও দেখা যায় বেশ কিছু কর্মক্ষেত্রে নারীর মজুরি পুরুষের চেয়ে কম (উদাহরণ স্বরপ দেখতে পারি অসংগঠিত ক্ষেত্রের বিভিন্ন কলকারখানা, ব্যাবসা ক্ষেত্র বা কৃষি ক্ষেত্র)। আন্তর্জাতিক ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশনের ২০০৯ এর এক রিপোর্ট অনুযায়ী, বর্তমান বিশ্বে পুরুষের চেয়ে নারী ১৬ ভাগ পারিশ্রমিক কম পায়। অপর এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, পৃথিবীতে নারীরা কাজ করছে শতকরা ৬৫ ভাগ, অথচও তার আয় মাত্র শতকরা দশ ভাগ। পৃথিবীতে নারী-পুরুষের সংখ্যানুপাত প্রায় সমান। অথচ, দুনিয়ার মোট সম্পদের একশ ভাগের মাত্র এক অংশের মালিক মেয়েরা। এবারে নারীদের অবস্থার কথায় আসি – তৃতীয় বিশ্বের দেশ গুলি সহ বহু উন্নত দেশে আজ নারীরা কখনও শ্লীলতাহানি, কখনও যৌন নির্যাতন, কখনও মেয়ে হিসাবে জন্মানোর জন্য চূড়ান্ত নিপীড়ন, আবার কখনও ধর্ষনের বা পারিবারিক হিংসার শিকার। তাহলে এই ঘটা করে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের কি প্রয়োজন? দেশের তাবর তাবর নেতা/ নেত্রীরা, মায় বুদ্ধিজীবী সমাজ কত ভালো ভালো কথা বলে থাকেন এই দিনে। বলা হয়ে থাকে এসব দিবস নাকি নারীকে সম্মানিত করেছে! এখান থেকেই নারীকে আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান করা হয়! তাঁদের জাগতে আহ্বান করা হয়! আমার কাছে পুরো ব্যাপারটাই প্রদীপের নীচে অন্ধকারের মতো লাগে।

আচ্ছা আমরা কি নারীকে দুর্বল, অবলা মনে করছি তাই এই ভাঁওতাবাজি? সন্মানের নামে লিঙ্গ বৈষম্যের সুক্ষ ভেদাভেদের পাঁচিল তুলে কি লাভ? আমরা কি ভুলে গেছি ভারতবর্ষে নারীরা সেই প্রাচীন বৈদিক কাল থেকে জীবনের সব দিক থেকে পুরুষের সমান মর্যাদা লাভ করতেন, যার উদাহরণ আমরা বিভিন্ন লেখায় পাই। এছাড়াও ঋকবেদ অনুযায়ী প্রাচীন ভারতে নারীদের উপযুক্ত বয়সে বিয়ে হত এবং গান্ধর্ববিবাহে বা স্বয়ংবরে তারা পতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা পেতেন। গার্গী, মৈত্রেয়ী, অপলা, লোপামুদ্রা, খনা (প্রকৃত নাম বোধহয় লীলাবতী) ইত্যাদি অনেক  বিদুষী নারীর উল্লেখ পাওয়া যায় আর আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম দিশারী রানি দূর্গাবতী, ঝাসির রানি লক্ষীবাই, সরোজিনি নাইডু, ভিকাজি কামা, ডাঃ অ্যানি বেসান্ত, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, বিজয়লক্ষী পণ্ডিত, রাজকুমারী অমৃত কৌর, অরুণা আসফ আলী, সুচেতা কৃপালিনী, নেতাজির ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির ঝাঁসি রেজিমেন্ট যা সম্পূর্ণ নারী বাহিনী দ্বারা পরিচালিত ছিল, ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী সেহগাল, এনাদের কথা আজ আমরা ভুলে গেছি। আর শুদু আমাদের দেশে নয় এরকম অগ্নিকন্যা ভারতের বাইরে অন্যান্য দেশেও ছিল ও থাকবে। এরকমই একজন ফরাসি নাট্যকার ও বিপ্লবী ওলিম্পে দ্যা গগ্স। ১৭৯১ সালে বিপ্লবী ওলিম্পে দ্যা গগ্স (Olympe de Gouges) 'নারী অধিকার এবং মহিলা নাগরিকদের ঘোষণা' প্রকাশ করেন। এতে তিনি বলেন, 'নারী জেগে উঠো - গোটা বিশ্বে যুক্তির সঙ্কেত ধ্বনি উচ্চারিত হচ্ছে। তোমার অধিকারকে আবিষ্কার করো। প্রকৃতির শক্তিশালী সাম্রাজ্য এবং পক্ষপাত, গোঁড়ামি, কুসংস্কার ও মিথ্যা দিয়ে অবরুদ্ধ নয়। সত্যের শিখা পাপ ও অন্যায় দখলের মেঘকে দূর করে দিয়েছে।' ১৭৯৩ সালে এনাকে ফাঁসি দেওয়া হয়। মৃত্যু পূর্বে অসীম সাহসিকতা নিয়ে তিনি বলেন, 'নারীর যদি ফাঁসি কাষ্ঠে যাবার অধিকার থাকে, তবে পার্লামেন্টে যাবার অধিকার থাকবে না কেন?'

তাহলে প্রশ্ন এটাই নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যদি নারী ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলতে পারে, নারী যদি নিজ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য পুরুষ শাসিত সমাজের সাথে লড়াই করতে পারে, তাহলে সে নারীর জন্য আলাদা করে নারী দিবসের সত্যিই কি কোন দরকার আছে? 

ইদানীংকালে সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখছি এক একটা বিশেষ দিনে মেসেজের/ পোস্টের ছড়াছড়ি, কত ভালো ভালো পোস্ট, দেখলে/ পড়লে মনে হয় সত্যিই দেশ উন্নতির পথে চলছে। কত বড় বড় নারীবাদী সমাজকর্মীরা, সমাজের মান্য গন্য ব্যাক্তিরা কত ভালো ভালো লেকচার দিচ্ছেন। অথচও আজকের যুগে, বলা যেতে পারে বিজ্ঞ্যাপনের যুগে নারীরা যে পন্যে পরিনত হচ্ছে, সেবিষয়ে তাঁরা চুপ কেন? জীবন দিয়ে সতীত্ব রক্ষা করার মত উদাহরণ আমাদের দেশে কম নেই, অথচ সেই সতীত্ব যখন টাকায় বিক্রি হয় এবং প্রগতিশীল সমাজ হাততালি দিতে থাকে এই বলে যে, নারী সাহসী হচ্ছে এবং এগিয়ে যাচ্ছে! বাহরে সমাজ বাহ!

আজকাল তো টিভি খুললেই চোখে পড়ে হরেক কিসিমের বিজ্ঞ্যাপন, একবার একটি ডিও-র অ্যাড এ দেখেছিলাম, একটি বাড়ীতে পুজা হচ্ছে, ঢাক বাজছে, সবাই নিজের কাজে ব্যাস্ত, এমন সময় একটি ছেলে ডিও দিয়ে বারান্দা দিয়ে আসার সময় একজন তরুণী বধূর সাথে ধাক্কা খায়, আর বধূটির ফ্যান্টাসিতে ভেসে ওঠে শরীরী খেলার এক টুকরো দৃশ্য। আচ্ছা এখানে পন্য কে? ডিও না ওই সুন্দরী বধূটি? এছাড়া কনডমের, নামিদামি কোম্পানির পারফিউমের বা পাউডারের বিজ্ঞ্যাপনে পন্য ঠিক কি তা বুঝে ওঠা যায় না। ঠিক যেমনই আইপিএল ক্রিকেট খেলায় চিয়ার লিডার নামি মেয়েদের নাচন কোদনের বাধ্যবাধকতা বোঝা যায় না। আমরা টিভি খুললেই দেখতে পাই কালো মেয়েদের ফর্সা করবার হরেক কিসিমের ক্রিম এর মনোহারী সব বিজ্ঞ্যাপন, এগুলি কি নারী সন্মান কে বাড়িয়ে দিচ্ছে? কখনও দেখানো হচ্ছে কোনও মেয়ে তাঁর কালো রঙের জন্যেই পিছিয়ে পরেছিল, কিন্তু বিশেষ কোম্পানির ক্রিম ব্যাবহারের ফলে ফর্সা হয়ে সবাই কে পিছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে, সত্যিই নারীর সন্মানের কি অপরুপ পরাকাষ্ঠা? আর এই বিজ্ঞ্যাপনগুলিতে কোনও না কোনও মেয়ে অভিনয় করছে! ঠিক এইভাবে সিনেমায় ‘সাহসী দৃশ্য’ নামে যে দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে তাকে কেউ কেউ নারীর এগিয়ে যাওয়ার নিদর্শন হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছেন, এর অর্থ কি এই দাঁড়ায় না যে  নারী পিছিয়ে ছিল কারণ নারী তখন অনেক পোশাক পরতো, এখন নারী পোশাক খুলছে তাই তারা এগিয়ে যাচ্ছে! আর এটাই প্রগতিশীলতা, আচ্ছা শুধু ভেঙে ফেলার নামই কি প্রগতিশীলতা? না ভাঙার পড়ে নতুন উন্নত কিছু সৃষ্টি করার নাম প্রগতিশীলতা ঠিক কোনটা? 

তথাকথিত নারীবাদীরা কি বুঝতে পারছেন, নারীর সম্মান সবচেয়ে বেশি কেড়ে নিচ্ছে তার পণ্য হওয়া? কনডমের, নামিদামি কোম্পানির পারফিউমের বা পাউডারের বিজ্ঞ্যাপনে যে মেয়েটা শরীর দেখাচ্ছে সে যে নিজেকেও ‘বিপণন যোগ্য পণ্য’ করে তুলছে, সেটা কি এই নারীবাদীরা ভাবছে? আমার শরীর আমার নিশ্চয়ই, কিন্তু ‘আমার শরীর’ ‘ইচ্ছে হলে ঢাকবো, নয় খুলবো’ এটা কি ঠিক? 

অনেকে বলবেন যাই হয় এই পুরুষ তান্ত্রিক সমাজের জন্যে হয়, সব দোষ পুরুষদের, তাঁরাই বাধ্য করে নারীকে পন্য হতে। কিন্তু সত্যি কি এটাই? পতিতা পল্লিতে যারা নিজের শরীরের ব্যবসা করে তারা পুরুষদের বলে কাস্টমার, আর তারা নিজেরা হয় ‘পন্য’, কিন্তু পতিতারা না হয় পেটের দায়ে দেহ বিক্রি করে। কিন্তু সমাজের বিভিন্ন পেশার শিক্ষিত নারীরা যখন সব জেনে বুঝে পণ্য হয় তারা কি পেটের দায়ে পণ্য হয়? নাকি শরীরের চাহিদার জন্য পণ্য হয়? নাকি একটা বাড়ি বা ফ্লাট, ব্যাংক ব্যাল্যান্স, বিলাসবহুল জীবনের জন্য পণ্য সাজে?

আমি নারীবিদ্বেষী নই, নারীদের দোষ দেখতে পুরুষদের দোষ খাটো করে দেখাতে লিখতে বসি নি। আমি মনে প্রানে বিশ্বাস করি এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষদের দায়িত্ব আরও অনেক বেশি। নইলে সোশ্যাল মিডিয়ায় বড়বড় লেকচার ঝেড়ে আর সুযোগ বুঝে ভিড় বাসে, ট্রেনে নারী শরীর ছুঁয়ে যাবার অদম্য ইচ্ছেতাকে চাপতে না পেরে সুযোগের সদব্যাবহার করে আর যাই হোক নিজের দায়িত্ব পালন করা যায় না। যদি আমরা দৈহিক ভিন্নতাকে অস্বীকার না করে দেহকে প্রাধান্য না দিয়ে একটু ভাবি তাহলে নারীরাও একজন পরিপূর্ণ মানুষ, তাঁরও নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা, চেতনা, সৃষ্টিশীলতা, ব্যাক্তিত্ব, বিবেক-বুদ্ধি-সম্মান রয়েছে, স্বাধীনতা রয়েছে, তাতে অযথা হস্তক্ষেপ না করে তাঁকে জীবনের পথে চলার অঙ্গ/সাথী বলে যদি ভাবতে পারি হয়তো শ্লীলতাহানি, যৌন নির্যাতন, মেয়ে হিসাবে জন্মানোর জন্য নিপীড়ন, ধর্ষনের বা পারিবারিক হিংসার মতো ন্যক্কারজনক ঘটনার হাত থেকে মুক্তি পেতে পারি। 

রবি ঠাকুরের একটি কবিতা দিয়ে লেখাটি শেষ করলাম – 

“শুধু বিধাতার সৃষ্টি নহ তুমি নারী 
পুরুষ গড়েছে তোরে সৌন্দর্য সঞ্চারি 
আপন অন্তর হতে। বসি কবিগণ 
সোনার উপমাসূত্রে বুনিছে বসন। 
সঁপিয়া তোমার 'পরে নূতন মহিমা 
অমর করিছে শিল্পী তোমার প্রতিমা। 
কত বর্ণ কত গন্ধ ভূষণ কত-না, 
সিন্ধু হতে মুক্তা আসে খনি হতে সোনা, 
বসন্তের বন হতে আসে পুষ্পভার, 
চরণ রাঙাতে কীট দেয় প্রাণ তার। 
লজ্জা দিয়ে, সজ্জা দিয়ে, দিয়ে আবরণ, 
তোমারে দুর্লভ করি করেছে গোপন। 
পড়েছে তোমার 'পরে প্রদীপ্ত বাসনা 
অর্ধেক মানবী তুমি অর্ধেক কল্পনা।“

(আমার এই লেখা কারও ভাবাবেগে/ স্বার্থে আঘাত দেওয়ার জন্যে নয়, আমি একজন অতি সাধারণ মানুষ, শিক্ষা-দীক্ষা, বুদ্ধিও অনেক কম, নিরেট মাথায় যতটুকু বুঝেছি লিখেছি মাত্র তাই দোষ ত্রুটি ও অধমের ধৃষ্টটা মার্জনীয়)