Sunday 25 June 2017

গুপ্তিপাড়ার রথ নিয়ে কিছু কথা




গুপ্তিপাড়ার রথ নিয়ে কিছু কথা

আমার আগের লেখায় গুপ্তিপাড়ার বৃন্দাবনচন্দ্র মঠ-এ অবস্থিত মন্দির সমুহের কথা উল্লেখ করেছি, আজ সোজা রথের দিনে গুপ্তিপাড়ার বিখ্যাত রথযাত্রা নিয়ে কিছু লেখা আর ছবি দিলাম।

গুপ্তিপাড়ার সংক্ষিপ্ত ইতিকথা

ব্যান্ডেল-কাটোয়া রেলপথে গুপ্তিপাড়া একটি অন্যতম বর্ধিষ্ণু জনপদ, গুপ্তি পাড়া নাম নিয়ে ঐতিহাসিক দের মধ্যে মতভেদ আছে। অনেকের মতে, সম্রাট আকবরের রাজত্ব কালে দশনামী সম্প্রদায়ের সত্যদেব সরস্বতী বলে এক মহাত্মা চারধাম ঘুরে এই গ্রামে উপস্থিত হন, গ্রামের মনোরম ও আধ্যাত্মিক পরিবেশ তাঁকে মুগ্ধ করে। তিনি এই গ্রামেরই কৃষ্ণবাটি সংলগ্ন এলাকায় গঙ্গাতীরে আশ্রম স্থাপন করেন। শোনা যায় পরে স্বপ্না দৃষ্ট হয়ে পার্শ্ববর্তী নদীয়া জেলার শান্তিপুর সংলগ্ন কন গ্রাম থেকে শ্রী বৃন্দাবনচন্দ্র জিউ-এর মূর্তি এনে নিজ আশ্রমে প্রতিষ্ঠা করেন। হয়ত যে স্থানে শ্রী বৃন্দাবনচন্দ্র অধিষ্ঠান করেন সেই স্থান বৃন্দাবন নামে অভিহিত হতে থাকে, আর যেহেতু অধিক পরিচিত ছিলনা, অধিকন্তু গুপ্ত ছিল তাই এই স্থান “গুপ্ত বৃন্দাবন পল্লী” বা “গুপ্ত পল্লী” পরে “গুপ্তিপাড়া” নামে অভিহিত হয়। অন্যমতে এই গ্রামে যে সমস্থ জাতির লোকজন বসবাস করতেন, তাঁদের মধ্যে বৈদ্য জাতিই অধিক সংখ্যাগরিষ্ঠ আর বর্ধিষ্ণু পরিবারভুক্ত ছিল, তাঁদের বেশিরভাগের উপাধি ছিল “গুপ্ত”, হয়ত এই কারনেই এই গ্রামের নাম “গুপ্ত পাড়া” পরে “গুপ্তি পাড়া” হয়। 

বৃন্দাবনচন্দ্র মঠের কথা

এই বৃন্দাবনচন্দ্র মঠ তারকেশ্বরের দশনামী সম্প্রদায়ের অধীনে পরিচালিত হয়ে থাকে, এই বছরে স্নান যাত্রা উপলক্ষে মোট ১০৮ ঘড়া গঙ্গাজল, দুধ, মধু ও ঘি সহযোগে প্রভু জগন্নাথের স্নান করিয়ে রথ যাত্রা উৎসবের সূচনা হয়, এই বছরে এই রথযাত্রা ২৭৮ বছরে পদার্পণ করল। বর্তমান মঠ অধ্যক্ষ হলেন স্বামী গোবিন্দানন্দ পুরী মহারাজ।   

রথযাত্রার কথা

আজ সকালে রৌদ্রজ্জ্বল আকাশ যেন হাতছানি দিয়ে ডাকল, মনে পরে গেল আগের বছর গুপ্তি পাড়ার রথ না দেখতে পাওয়ার কথা। অতএব মাথার ভুতটা নেচে উঠলো, ক্যামেরা গুছিয়ে বেরিয়ে পরলাম গুপ্তিপাড়ার উদ্দেশে। ষ্টেশনে এসে পেয়ে একটু লেটে এসেও পেয়ে গেলাম হাওড়া- কাটোয়া লোকাল। কোনওমতে ঠেলে উঠে দেখি ভিড়ে ভিড়, ঠিকমতো দাঁড়ানোর জায়গা নেই। কোনওমতে দাঁড়িয়ে আশেপাশে তাকিয়ে দেখি অনেকেই চলেছে জগন্নাথ দর্শনে। কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানতে পারলাম অনেকে চলেছে কালনা, মায়াপুরের রথ দর্শনে, আবার কেউ কেউ আমারই মত গুপ্তিপাড়ার যাত্রী। 

যাইহোক ধাক্কা খেতে খেতে কোনওমতে গুপ্তিপাড়া ষ্টেশনে নেমে দেখি ভালই ভিড়, পুন্য কামী মানুষের ভিড় চারিদিকে, ষ্টেশনের বাইরে এসে দেখি ভ্যান, রিকশা, টোটো, অটো সবই হাজির। আমি চেপে বসলাম একটি টোটো তে, তবে টোটোচালক ভাইটি আগেই সতর্ক বার্তা শুনিয়ে রাখল বৃন্দাবনচন্দ্র মঠ অবধি যাওয়া যাবে না, তার আগেই নেমে পরতে হবে। কারন পুলিশ, প্রশাসনের সেরকমই নির্দেশ। হোলও তাই, বেশ খানিকটা আগে নেমে পরতে হল, নেমে অবশ্য মনঃটা ভাল হয়ে গেল, দূরে রথ দেখে আর চারপাশে জনস্রোত দেখে।         

বছরের অন্যসময়ে ঐতিহ্যপূর্ণ বৃন্দাবনচন্দ্র মঠের পাশে বছরভর এই রথ পেল্লাই টিনের খাঁচায় ভরা থাকে। এই রথ চার তলা, উচ্চতা প্রায় ৩৬ ফুট, দৈর্ঘ্য ও প্রস্ত ৩৪ ফুট করে। বৃন্দাবন মন্দির থেকে জগন্নাথ,বলরাম আর সুভদ্রা রথে চড়ে যান প্রায় এক কিলোমিটার দূরে গোসাঁইগঞ্জ-বড়বাজারে মাসির বাড়ি, মানে যা ‘গুণ্ডিচা’ বাড়ি নামেই বেশি পরিচিত।

রথের সামনে গিয়ে দেখি রথের সাজসজ্জা চলছে, রথে বিশাল লম্বা সব দড়ি লাগানোর কাজ হচ্ছে, দেখে তো মনে হল এক একটা দড়ি প্রায় ২০০-২৫০ ফুট লম্বা তো হবেই, তার বেশি হলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। এই সম্পর্কে মনে পরে গেল জনৈক প্রফুল্লকুমার পান মহাশয় লিখেছেন - “গুপ্তিপাড়া-রথ-কাছি ক্রমে ছোট হয়। রথের টান-কালে তা ছিঁড়ে ছিঁড়ে নেয়।। ছেঁড়া-কাছি ঘরে রাখে শান্তির কারণে। কত শত মনোবাঞ্চা পূর্ণ হয় মনে।।”

হায়রে মনোবাঞ্চা এই জনমে তা আর পুরন হবে না, প্রভু জগন্নাথ তাঁর এই নরাধম ভক্তটিকে নেকনজরে কোনদিনও দেখবেন না তা ভালই বুঝে গেছি। যাক আমার কথা বাদ থাক, আজকের এই পুন্য দিনে প্রভুর কথাই শোনা যাক।

রথের সাজ সজ্জা প্রায় শেষ, মাইকে ঘোষণা হল প্রভু জগন্নাথ বলরাম, সুভদ্রার সাথে রথে আরোহণ করবেন এবার, সব দর্শক, ভক্তবৃন্দ ফটোগ্রাফারের দল উৎসুক, ব্যাস্ত হয়ে উঠলো। যে সব ফটোগ্রাফারের দল মাটিতে শুয়ে নানান পজে ছবি তুলছিলেন তাঁরা সবাই ধুলা ঝেড়ে প্রস্তুত হতে লাগলেন। এই শর্মাও ঘুরে ঘুরে মানুষের মেলায় মানুষ দেখে মুগ্ধ হচ্ছিলো, হয়তো কোনও রাঁধারানী কে দেখতে পাওয়ার আশা ছিল সুপ্ত এই মনে, কিন্তু সম্বিত ফিরল জয় জগন্নাথ ধ্বনি শুনে, দেখি – প্রভু হাজির পাণ্ডাদের ঘাড়ে চেপে। যত সহজে বলরাম, সুভদ্রা রথে চেপে গেলেন, দেখলাম প্রভু জগন্নাথ এর ততটাই অনীহা রথে চাপায়, শেষে কিনা তাঁকে লাল শালু দিয়ে বেঁধে তুলতে হল! সেও এক অপূর্ব দৃশ্য, জার বর্ণনা করার শক্তি এই অধমের নেই। শুদু দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিলো প্রভু জগন্নাথও আমাদেরই মতন রক্তমাংসের মানুষ, তাঁরও জ্বর হয়, নিমের পাঁচন, নানাবিধ জড়িবুটি খেয়ে সুস্থ হতে হয়। এই এত আয়োজন, এত ভক্তি- ভালোবাসা সব তাঁরই জন্যে, তিনি যে আমাদের পরিবারেরই একজন মাত্র। 

এক ফাঁকে টুক করে চলে গেলাম বৃন্দাবনচন্দ্র মঠে, গিয়ে দেখি সে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে ভিতরে, রান্না বান্না, বই বিক্রি, সার দিয়ে ভক্তবৃন্দরা সব বসে আছে, এক জায়গায় ফটোগ্রাফারের দল ডেরা বেঁধেছে, তাঁদের মধ্যে ফটো আর ক্যামেরা সংক্রান্ত ভাবগম্ভীর আলোচনা চলছে। না ওখানে আমার মত ক্ষুদ্র মানুষের ঠাই কোথায়? এদিক সেদিক ঘুরে দেখতে দেখতে দেখি একজায়গায় কয়েকজন সিসিটিভি নিয়ে বেশ নাকাল, কথা শুনে বুঝলাম জিওর টাওয়ার না পাওয়ায় ভারি বিপত্তি হয়েছে তাঁদের, পকেট থেকে মোবাইল বের করে দেখি হ্যাঁ ঠিক তাই, জিও দেহ রেখেছে। একদল আবার দেখি দ্রোণ নিয়ে দৌড় লাগাল, একটু অবাক হলাম, তবে প্রশাসন কে সাধুবাদ জানাতেই হয়, প্রচুর সিসিটিভি, পুলিশ, স্বেচ্ছা সেবক দিয়ে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার। ইতিমধ্যে মনটা কেমন যেন জিলাপি খাবো বলে ডেকে উঠলো, সুতরাং ফের আমি মেলা চত্বরে এসে হাজির, এসে দেখি না শুদু জিলাপি কেন? নিমকি, গজা, ম্যায় এগরোল, চাউমিনও হাজির, আমি যথাক্রমে জিলাপি, নিমকি আর আইসক্রিম দিয়ে কাজ চালিয়ে নিলাম। 

ইতিমধ্যে কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানতে পারলাম নো এন্ট্রি চালু হয়ে গেছে অতএব টোটো, অটোর আশা ছাড়তে হবে। ফিরতে গেলে বেশ খানিকটা হাটি হাটি পা পা ছাড়া গতি নেই। গাছের তলায় বসে আবার মানুষ দেখতে লাগলাম, সত্যি মানুষ দেখে আর আশ মেতে না। কত রকমের, কত রুপের মানুষ। সবাই ব্যাস্ত নিজের নিজের দুনিয়ায়, কেউ এসেছে পুন্যের লভে, কেউ বা নিছকই বেড়াতে, কেউ বা দোকানদারি নিয়ে হাজির এই মেলায়। কেন জানিনা ভাল লাগছিলো না আর, অতএব রথের টান না দেখেই হাঁটা দিলাম ষ্টেশনের দিকে। হয়তো ভাল না লাগার ভুতটা আবার ভর করেছিলো মাথায়, যেতে যেতে ভাগ্যক্রমে এক টোটো কাকার সাথে দেখা, ষ্টেশনের কথা জিজ্ঞেস করাতে আপাদ মস্তক দেখে নিয়ে সুধালো – বাবা রথের টান দেখবে না? আমি বললাম না কাকা, আর ভাল লাগছে না, তাই ফিরে যাচ্ছি। কাকা বলল – সে কি গো? টান না দেখেই ফিরে যাবে, ওটা দেখতেই তো সবাই আসে এখানে। একটু হেঁসে বললাম না শরীর টা ভাল লাগছে না তাই ফিরে যাচ্ছি, পরের বার নিশ্চয়ই দেখবো। কাকা বলল – উল্টো রথে এসো না, আমাদের এখানে ভাণ্ডার লুঠ হয় জানো নিশ্চয়ই? মাথা হেলিয়ে বললাম – হ্যাঁ কাকা জানি, দেখি সুযোগ হয় কিনা?

আসুন যেতে যেতে আপনাদেরও শুনিয়ে যাই সেই অপূর্ব কাহিনি - একটা-দু’টো মালসা নয়, সংখ্যায় চারশোরও বেশি। মাটির এক-একটা মালসায় প্রায় পাঁচ কিলো খাবার, থুড়ি প্রভু জগন্নাথের প্রসাদ। যা লুঠ করে সমবেত ভক্ত বৃন্দ, আজও প্রাচীন প্রথামতো উল্টোরথের আগের দিন হয় এই ‘ভাণ্ডারা লুঠ’। 
‘ভাণ্ডারা লুঠ’-এর নেপথ্যে যে পৌরাণিক এক প্রেম কাহিনী রয়েছে তাঁর গল্প শোনাই এবার - একবার মা লক্ষ্মীর সঙ্গে মন কষাকষি হওয়ায় প্রভু জগন্নাথ লুকিয়ে মাসির বাড়িতে আশ্রয় নেন। মা লক্ষ্মী ভাবলেন, স্বামী বোধহয় পরকীয়ার টানে পালিয়েছেন (হাজার হোক বৌয়ের মন তো)। শ্রী বৃন্দাবনের কাছে জানতে পারলেন প্রভু জগন্নাথ রয়েছেন মাসির বাড়িতে। স্বামীর মতিস্থির করাতে লক্ষ্মী লুকিয়ে ওই বাড়িতে ‘সর্ষে পড়া’ ছিটিয়ে আসেন, পরে জানতে পারেন মাসির বাড়ীর উপাদেয় খাদ্য সমুহের জন্যেই প্রভু জগন্নাথ নাকি আসতে পারছেন না। তখন মা লক্ষ্মীর অনুরোধে শ্রী বৃন্দাবন লোকলস্কর নিয়ে যান মাসির বাড়ি, গিয়ে দেখেন, তিনটি দরজাই বন্ধ। দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকে তাঁরা সারি সারি মালসার খাবার লুঠ করে নেন, শেষে প্রভু জগন্নাথ মনের দুঃখে মা লক্ষ্মীর কাছে ফিরে আসেন। এই সম্পর্কে প্রফুল্লকুমার পান মহাশয় তাঁর ‘গুপ্তিপাড়ায় শ্রী শ্রী বৃন্দাবন জিউর আবির্ভাব ও রথযাত্রা’ বইতে এর পরিচয় দিয়েছেন এ ভাবে — “লন্ডভন্ড হয়ে যায় ভোগ উপাচার।/ তাতে জগন্নাথে হয় চেতনা সঞ্চার।”

উল্টোরথে বিকাল সাড়ে ৫টা নাগাদ একসঙ্গে খোলে মাসির বাড়ির তিনটি দরজা। ভিতরে রাখা থাকে এই উপাদেয় মালসা ভোগ গুলো।  কি ভাবছেন যাবেন নাকি একবার গুপ্তি পাড়ায়? যেতেই পারেন, যদি গায়ের জোরে আর ঠেলাঠেলি করে ভাগ বসাতে পারেন এই সব উপাদেয় খাবারে তো লাইফ জিঙ্গালিলা হতে বাধ্য,  সে দিক থেকে রথযাত্রায় এই আকর্ষণ কিন্তু কম নয় কোনও অংশে। 
আপনারা ঠিক করুন যাবেন কিনা? আর আমি ফিরে চলি নিজ নিকেতনে। গতানুগতিক জীবনে আবার গা ভাসিয়ে দিতে, তবু এই ছোট ছোট বেড়ানো, ছবি তোলা, মানুষের সাথে পরিচয় আছে বলেই হয়তো আজও বেঁচে রয়েছি। আজ এই পর্যন্তই, আবার ফিরে আসবো এরকমই কোনও গল্প সাথে নিয়ে। সাথে থাকুন, সঙ্গে থাকুন। ভাল থাকবেন সবাই, শুভ রথযাত্রা। প্রভু জগন্নাথ সবার মঙ্গল করুন।

(এই বছরে গুপ্তি পাড়ার রথ পদার্পণ করল ২৭৮ বৎসরে, ঐতিহ্যে ও ইতিহাসের পট ভুমিকায় এই রথের স্থান পুরী ও মাহেশের পরেই, ছবির জন্যে ফটো আলব্যাম দেখুন। আর যদি কেউ বৃন্দাবনচন্দ্র মঠের সাথে যোগাযোগ করে যেতে চান তাহলে মহান্ত মহারাজ শ্রী শ্রী স্বামী গোবিন্দানন্দ পুরি মহারাজ কে এই নম্বরে ফোন করে যেতে পারেন - ৯৭৩২৬ ৪৭৩৯১/ ৮০১৬৭ ১৭৭৭৬) 

Thursday 22 June 2017

‘অম্বুবাচী’ নিছকই কি একটি ধর্মীয় প্রথা না মাতৃশক্তির আরাধনা!


‘অম্বুবাচী’ নিছকই কি একটি ধর্মীয় প্রথা না মাতৃশক্তির আরাধনা!

আমাদের হিন্দু শাস্ত্রে পৃথিবীকে ধরিত্রী মাতা হিসাবে কল্পনা করা হয়েছে, আরাধনা করা হয়েছে। এই গাছ, ফুল, পাখি, মানুষ, জীব জগত সবই এই ধরিত্রী মাতারই সন্তান। এবারে সংক্ষেপে দেখে নেওয়া যাক ‘অম্বুবাচী’ কি? এবং আমাদের দেশে কিভাবে পালন করা হয়?

মহাজাগতিক নিয়মে পৃথিবী যখন সূর্যের মিথুন রাশিস্থ আদ্রা নক্ষত্রে অবস্থান করে সেদিন থেকে বর্ষাকাল শুরু ধরা হয়। যেহেতু আগে আমাদের দেশ, সমাজ কৃষি ভিত্তিক ছিল (হয়তো এখনও আছে, এই বিষয়ে যুক্তি বা তর্ক এড়িয়ে যেতে চাই), আমরা তাই হয়তো আষাঢ় মাসের শুরুতে পৃথিবী যখন বর্ষার নতুন জলে সিক্ত হয়ে ওঠে তখন তাকে ঋতুমতি নারী তথা মাতা রূপে গণ্য করা হয় এবং মেনে চলা হয় এক রীতি যা অম্বুবাচী প্রবৃত্তি হিসাবেই পরিচিত, আর এর ঠিক তিন দিন পরে এই রীতি শেষ হয়, এটাকে বলা হয় অম্বুবাচী নিবৃত্তি। এই নিবৃত্তির পরই প্রাচীন কালে ভারতে জমি চাষ বা কর্ষণ করত কৃষকেরা। এর পিছনে যে ধারণা যুগ যুগ ধরে চলে এসেছে তা হল – নারী  রজঃস্বলা হয় প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মে আর তারপরেই সেই নারী তারপরই সন্তান ধারণে সক্ষম হন। ঠিক তেমনি প্রতিবছর অম্বুবাচীর এই তিনদিনকে পৃথিবীর বা মা ধরিত্রীর ঋতুকাল ধরা হয়, এই তিন দিন জমিতে কোনও চাষবাস, কৃষিকাজ করা হয় না। এখনও ভারতের বিভিন্ন জায়গায় এ নিয়ম মেনে চলা হয় আর এটা রজোৎসব নামেও পালিত হয়।

এই অম্বুবাচীর সময়ে ব্রহ্মচারী, সাধু,সন্ন্যাসী, যোগীপুরুষ, বিধবা মহিলারা অনেকেই এই সময়ে পৃথিবীকে মা ধরিত্রী হিসাবে কল্পনা করে নিয়ে আগুন দ্বারা প্রস্তুত কোনও রান্না করা খাবার কিছু খান না, বেশিরভাগই ফলমূল খেয়ে থাকেন। আধুনিক সমাজ এটাকে হিন্দুদের একটা লৌকিক আচার হিসাবেই ভাবে, কিন্তু এর পিছনে যে শ্রদ্ধা, ভক্তি বা প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা আছে সেটাকে স্বীকার করেন না। 

অম্বুবাচীর বা অমাবতির সব থেকে বড় উৎসব বা মেলা হয় ভারতের আসাম রাজ্যের গুয়াহাটি শহরের পশ্চিমাংশে নীলাচল পাহাড়ে অবস্থিত কামাক্ষ্যা মন্দিরে। এ বার ২২ জুন বন্ধ হবে মন্দির, খুলবে চার দিন পর। ওই সময়ই শুরু হবে অম্বুবাচী মেলা, ইতিমধ্যেই গেরুয়া, লাল, কালো বস্ত্রে সজ্জিত সাধু-সন্ন্যাসীরা রওনা হয়ে গেছেন মন্দিরের পথে। কি ভাবছেন একবার যাবেন নাকি কামাক্ষা? যেতেই পারেন ঘুরে আসতে পারেন আর পরিচয় করতে পারেন বিশাল এই দেশের আধ্যাত্মিক চিন্তা ভাবনার এক অংশের সাথে। 

Wednesday 21 June 2017

অথ সেকু, মাকু সম্বাদ



অথ সেকু, মাকু সম্বাদ

ভারতবর্ষের তথাকথিত সেকু, মাকু বুদ্ধিজীবীরা কি জানেন? পাকিস্থানে সংখ্যালঘু হিন্দুদের কথা? না মনে হয়! ওনারা তো নিজ দেশে সংখ্যালঘুদের নিয়েই চিন্তিত, কে কতখানি দরদ দেখাতে পারছেন কিংবা কতখানি নিজেকে উদার, আধুনিক মনস্ক হিসাবে দেখাতে পারছেন সে বিষয়েই সদা ব্যাস্ত তাঁরা। সাধু উদ্যোগ বটেই, নিজেদের আখের গুছিয়ে নেওয়ার রাস্তা দেখার সাংবিধানিক অধিকার যখন রয়েছেই। সব থেকে আশ্চর্য লাগে আমাদের বামপন্থী বুদ্ধিজীবী নেতা/নেত্রিদের দেখলে! যারা একদিন কিউবা, মায়নামার-এ মানবাধিকার লঙ্ঘন (সেই সঙ্গে নিজদেশে ঘণ্টা বাজান তো আছেই) নিয়ে পথ ঘাট, দৈনন্দিন জীবন স্তব্দ করে দিতেন তাঁরা পাকিস্থানে এহেন কার্যকলাপের বিরুদ্ধে রা কাটছেন না কি ব্যাপার? পাছে প্রতিবেশী সংখ্যালঘু ভাইটি/ দাদাটি গোসা করে?

একটু দেখে নেওয়া যাক বর্তমানে পাকিস্থানে সংখ্যালঘু হিন্দুদের অবস্থা। জন্মলগ্নে পাকিস্তানে হিন্দু জনজাতির হার ছিল ২৩ শতাংশ, হিহি না সময়ের সাথে সাথে এই হার উদ্ধমুখি নয়, উল্টে কমেছে মারাত্মক হারে। কে জানে হয়তো পাকিস্থানে হিন্দু জন্মহার সরকারিভাবে নিয়ন্ত্রিত। কত একটু শুনবেন? ২০১৭-তে এসে দেখা যাচ্ছে, তা দাঁড়িয়েছে মোটে ৬ শতাংশে। দুষ্টু লোকে কয় নাকি জোর করে ধর্মান্তকরণের জেরেই দলে দলে পাকিস্তান ছাড়ছেন সংখ্যালঘু হিন্দুরা, কি মিথ্যাচার বলুন দেখি? 
সব পেয়েছির দেশ পাক পাকিস্থানে ধর্মের ভিত্তিতে দেশ আদায় থুড়ি দেশভাগ শোনা কথা প্রতিশ্রুতি অবশ্য অন্যরকমই ছিল, বলা হয়েছিল - পাকিস্তানে সব ধর্মের মানুষই তাঁদের ধর্মাচরণের সমান অধিকার পাবেন, অক্ষুণ্ণ থাকবে হিন্দুদের মৌলিক অধিকার, তাঁরা সসম্মানেই সেদেশে থাকতে পারবেন, একদিন যে দেশ তাঁদের নিজেদেরই ছিল, কিন্তু কতিপয় রাজনৈতিক নেতার উচ্চাশার বলি হয়ে সেই দেশ ভাগের নামে সীমারেখা টেনে দেওয়া হল। আজকের বাস্তব বলছে সে প্রতিশ্রুতি তো পরে রাখা হয়ইনি, উলটে ফুঁ দিয়ে উড়িয়েই দেওয়া হয়েছে প্রতি পদে পদে! বেড়েছে জোর করে ধর্মান্তকরণের ঘটনা, পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়েছে যে গত কয়েক দশকে পাকিস্তান থেকে অনেক হিন্দু পরিবার চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। 

কি রকম সেই পরিস্থিতি (একটু গুগুল করে, বিভিন্ন পত্র পত্রিকার পাতা উল্টে বা রাষ্ট্রসংঘের বিভিন্ন ঘোষণা/ আর্টিকেল একটু পরে নিন না), যারা তবু শুনতে চান তাঁদের উদ্দেশে বলি ধরুন ডেমো হিসাবে এই সামান্য কিছু উল্লেখ করলাম – বেঁছে বেঁছে সংখ্যালঘু হিন্দু মহিলাদের উপর চলেছে ধর্ষণ, শ্লীলতাহানির মতো ঘটনা। হিন্দু পরিবার গুলিকে বলা হচ্ছে হয় পবিত্র ধর্ম গ্রহন করো নইলে মর, ব্যাবসায়ি, চিকিৎসক প্রভৃতি পেশার ব্যাক্তিদের অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি ইত্যাদি নানবিধ দাওয়াই প্রয়োগ চলছেই। তবে ডোজ এমন মাত্রায় পৌঁছেছে যে পাকিস্তানে হিন্দুদের বসবাস ছিল ইহা ভবিষ্যতে ইতিহাস বইতেই ঠাই পাবে, আগে পাকিস্থানের অনেক জায়গাতেই হিন্দুদের দেখা মিলত, কিন্তু এখন লুপ্তপ্রায় প্রজাতির মতো সিন্ধ প্রদেশ ও গুটিকয় জায়গা ছাড়া সে দেশে হিন্দুদের দেখা মেলাই ভার।

একটি বহুল প্রচলিত নিউজ পেপারে দেখলাম - যে সিন্ধ প্রদেশে প্রতি বছর প্রায় ১০০০ মহিলাকে জোর করে পবিত্র ধর্ম গ্রহণ করানো হয়, প্রতি মাসে প্রায় ২০ জন মহিলা বিশেষত তরুণীরা এর শিকার হন। স্থানীয়  প্রশাসন কে জানালেও কোনও সুরাহা হয় না সাহায্য তো দূর অস্ত! আর একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রতি বছর প্রায় ৫০০০ জন হিন্দু পাকিস্তান ছেড়ে ভারতেই আশ্রয় নিচ্ছেন।
অতএব কি দেখলাম বন্ধুরা? অসহিস্নুতার দেশ, উগ্র জাতীয়তার দেশ এই ভারতে শরণার্থী আসছে, ভালো ভালো রাজনৈতিক ব্যাপারীদের কাছে এর থেকে ভালো কি হতে পারে? যত শরণার্থী তত ভোট ব্যাংক। 

জয় হোক ভারতের, জয় হোক তাবড় তাবড় সেকু, মাকু বুদ্ধিজীবী, তথা রাজনৈতিক ব্যাপারীদের।

(এই অধম নিতান্তই ছাপোষা কেরানী গোত্রের, আমি না পারি তথাকথিত হিন্দুত্তের ধ্বজা ওড়াতে, না পারি তথাকথিত সেকুলার সাজতে, তাই আমাকে নিতান্তই নগন্য মনে করে ক্ষমা করিয়া দিবেন। আশাকরি রাষ্ট্রদ্রোহী বা জাতিশত্রু বলে দেগে দেবেন না।)